চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সরকারের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম—দূষিতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২১ সালের ৩ অক্টোবর গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ৩১তম বিসিএস কৃষি ক্যাডারের সদস্য। দীর্ঘ ৩ বছর ৮ মাস তিনি একই কর্মস্থলে থেকে ঘুষ দুর্নীতি করে কর্মজীবন পার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ থাকার সত্ত্বেও গত ৪ জুন তাঁকে কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের কার্যালয়ে অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিপি) পদে পদোন্নতি দিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। তাঁর পদোন্নতিতে জেলাজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এ নিয়ে রবি নার্সারির স্বত্বাধিকারী রবিউল ইসলাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামাড়বাড়ি, দুদক, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক, জেলা প্রশাসক ও ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।চিঠি সূত্রে জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ছাইফুল আলমের ৪ জুন স্বাক্ষরিত এক পত্রে ৩০ জুনের মধ্যে গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সরকার বর্তমান কর্মস্থল (গোমস্তাপুর) হতে অবমুক্ত হয়ে বদলীকৃত কর্মস্থল কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের কার্যালয়ে অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিপি) পদে যোগদান করবেন। অন্যথায় আগামী ১ জুলাই থেকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত হবেন। তবে তিনি এখন পর্যন্ত নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি। তাঁর পূর্বের কর্মস্থলে রয়ে গেছেন।অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রণোদনা সার ও বীজ সিংহভাগ কৃষকদের না দিয়ে বিতরণ, প্রণোদনার টাকা বিতরণে নয়—ছয়, ভুয়া বিল ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি ভর্তুকির কৃষি যন্ত্রাংশ সাধারণ কৃষকদের না দিয়ে টাকার বিনিময়ে অকৃষকদের মাঝে বিতরণ, বিভিন্ন দোকান থেকে প্রণোদনার বীজ নিয়ে নিজের ইচ্ছামতো বিল ভাউচার করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এতসব অভিযোগ থাকার সত্ত্বেও তাঁকে পদোন্নতি দেওয়ায় ক্ষুব্ধ উপজেলার সাধারণ কৃষকরা।নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গোমস্তাপুর উপজেলায় তানভীর আহমেদ সরকারের চেয়ে খারাপ আর কর্মকর্তা এ উপজেলায় কখনো যোগদান করেননি। তিনি উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন। ছোটখাটো ভুল নিয়ে খুব বকাঝকা করতেন। তাঁর কাজের গোপনীয়তা ছিল অনেক। ভূয়া বিল ভাউচার করে কোটি কোটি টাকা তিনি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের কার্যালয়ের সাবেক উপপরিচালক ড. পলাশ সরকার অনিয়ম—দূষিতি করেছেন। এ নিয়ে বহুবার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগও হয়েছে। তদন্তও হয়েছে। ক্ষতিপূরণ চেয়ে সাধারণ কৃষক উকিল নোটিশও করেছেন। আর এর সহযোগী হিসেবে ছিলেন গোমস্তাপুর উপজেলার উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সেরাজুল ইসলাম।রবি নার্সারির স্বত্বাধিকারী রবিউল ইসলাম জানান, তানভীর আহমেদ সরকার কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে আমার কাছে দীর্ঘদিন বিভিন্ন চারাগাছ নিয়েছেন। অনেকদিন পর টাকা তিনি পরিশোধ করতেন। আমার থেকে তিনি বিল ভাউচারের দুটি ফাঁকা বই নিয়ে গেছেন। তিনি তাঁর ইচ্ছামতো বিল ভাউচার করে বিভিন্ন দপ্তরে পাঠাতেন এবং উঠিয়ে লাখ লাখ টাকার দুর্নীতি করেছেন। এছাড়া আমাকে পলিনেট হাউজ দেওয়ার কথা বলে তাঁর অফিসে ডেকে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করলে, সেটা আমি না দেওয়ায় আমাকে পলিনেট হাউজ দেয়নি। পরে ঘুষের বিনিময়ে অন্য কৃষকদের তিনি পলিনেট হাউজ দিয়েছেন। আমাকে পলিনেট হাউজ না দেওয়ার প্রতিবাদ করলে তিনি পুলিশ দিয়ে উঠিয়ে নেওয়ার হুমকি দেন। পরে ক্ষতিপূরণ চেয়ে উকিল নোটিশও পাঠিয়েছি।তিনি আরও বলেন, কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি করে তিনি ডাচ বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে তাঁর স্ত্রী, শ্বাশুড়ি, শ্বাশুড়ির নামে উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সেরাজুল ইসলামের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যদি তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করে তাহলে থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে।নয়াদিয়াড়ী গ্রামের কৃষক আসাদুল ইসলাম বলেন, গ্রীষ্মকালীন পেয়াজের প্রণোদনার টাকা না পাওয়ায় সাংবাদিকদের বক্তব্য দিয়েছিলাম। সেজন্য কৃষি অফিসার তানভীর আহমেদ সরকার আমার মতো যারা প্রণোদনার টাকা না পেয়ে সাংবাদিককে বক্তব্য দিয়েছিল, তাদের সবাইকে হুমকি দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে কৃষি অফিসে ডেকে মুচলেকা লিখে নিয়েছেন। প্রণোদনার টাকা পেয়েছে মর্মে। এমনকি ভিডিও করে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ওই ঘটনার পরে কৃষি অফিসের কোন প্রণোদনা পায়নি। শুনেছি তিনি অনেক দুর্নীতিবাজ একজন কর্মকর্তা। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, এটাই আমাদের দাবি।এদিকে, গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সরকারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।অপরদিকে, গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সেরাজুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন দিয়ে ফোনে রিং হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. ইয়াছিন আলী বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এসকে/এইচএ
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
