কিশোরগঞ্জ থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ট্রেনে টিকিট ছাড়া যাত্রীদের ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়ে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করার অভিযোগ উঠেছে অসাধু রানিং স্টাফদের বিরুদ্ধে। খাবার গাড়ির লোক, জিআরপি পুলিশ, অ্যাটেন্ডেন্টসহ অসাধু রানিং স্টাফরা টাকার বিনিময়ে বিনা টিকিটে যাত্রীদের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন। দেখার কেউ না থাকায় প্রতিদিন রেলওয়ে লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।অভিযোগ রয়েছে, রেলের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে বিনা টিকিটে ভ্রমণসহ যাত্রীদের প্রকাশ্যে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন ক্যাটারার্সরা। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকা যাওয়ার আন্তঃনগর এগারোসিন্ধুর প্রভাতী ও এগারোসিন্ধুর গোধূলি এবং কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনে বিনা টিকিটের একজন যাত্রীর কাছে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা করে নেয়া হয়। কিশোরগঞ্জ স্টেশন থেকে চলাচলকারী তিনটি ট্রেনে প্রতিদিন গড়ে বিনা টিকিটের হাজারের অধিক যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। সেই হিসেবে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা পকেটস্থ করছেন অসাধু রানিং স্টাফরা। এছাড়া যারা বিনা টিকিটের যাত্রী, তাদের বিমানবন্দরসহ অন্য স্টেশন পার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। যারা টাকা দিতে পারছেন, তারাই কেবল খাবার গাড়িতে থাকছেন। আর যারা দিতে পারছেন না, তাদের সেখানে দাঁড়িয়েও থাকতে দিচ্ছেন না ক্যাটারার্সরা। এ নিয়ে অনেকের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটিও হতে দেখা যায়।কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা যায়, ভৌগলিক কারণে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন গুরুত্বপূর্ণ। সারা বছর ধরেই এখানে যাত্রীচাপ থাকে। এই স্টেশনের উপর নির্ভরশীল হাওরের তিনটি উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহের নান্দাইল, ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মানুষ। কিশোরগঞ্জ স্টেশন দিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম রুটে আন্তনগর ও মেইল ট্রেনসহ মোট ৫টি ট্রেন চলাচল করে। প্রতিদিন এই স্টেশন থেকে প্রায় পাঁচ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। ঈদে তা বেড়ে দ্বিগুণ হয়।সরেজমিন কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ১২ থেকে ১৪ কোচের ট্রেনে প্রতি কোচে ৬০ জনের ধারণক্ষমতা। অথচ দ্বিগুণ যাত্রী নিয়ে কিশোরগঞ্জ স্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায় এগারোসিন্ধুর গোধুলি ও কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস নামের দুটি ট্রেন। ট্রেন দুটিতে দেখা যায় দায়িত্বরত অ্যাটেন্ডেন্ট সদস্যরা প্লাটফর্ম থেকে যাত্রীদের ডেকে নিয়ে টাকার বিনিময়ে ট্রেনে ভ্রমণের সুযোগ করে দিচ্ছেন। অসাধু রেলওয়ে পুলিশের সদস্যরা টিকিটবিহীন যাত্রীদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে খাবার গাড়ি ও দুই কোচের মাঝখানে যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা করেন। ক্যাটারিং সার্ভিসের সদস্যরা একই কায়দায় অবৈধভাবে খাবার গাড়িতে যাত্রী পরিবহন করছে। এ ছাড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচের অ্যাটেন্ডেন্ট ও এসি অপারেটররা টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে এসি কোচে এবং দুই কোচের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় যাত্রী তুলছেন। কর্মরত টিটিইদের ট্রেনে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা টিকিট চেক করেন না। ট্রেনে দায়িত্ব পালনরত অনেকেরই দেখা যায় নেমপ্লেট নেই।বিনা টিকিটে ট্রেনে ওঠা এক যাত্রী বলেন, তার এক আত্মীয় অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাকে দেখতে ট্রেনযোগে যাত্রা। অনেক চেষ্টা করেও টিকিট না পাওয়ায় বিনা টিকিটে ট্রেনে ওঠেছি। ট্রেনে ওঠার কিছুক্ষণ পরেই একজন খাবার গাড়ির সদস্য টিকিট দেখতে চান। টিকিট নেই জানালে ৫০০ টাকা দাবি করেন। প্রথমে দিতে না চাইলে মোটা অঙ্কের টাকা জরিমানা ও জেলের ভয় দেখায়। পরে আত্মসম্মানের ভয়ে ২৫০ টাকা দিতে বাধ্য হই, যদিও ভাড়া ১৫০ টাকা।এগারোসিন্ধুর গোধুলির ট্রেনে করে নরসিংদী যাচ্ছিলেন দুই সন্তানের মা আকলিমা আক্তার। তিনি বলেন, আমাদের কাছে টিকিট না থাকায় খাবার গাড়ির লোকের সঙ্গে ৫০০ টাকায় নরসিংদী যাওয়ার ভাড়ার চুক্তি হয়েছে।এদিকে, নাম-পরিচয় জানতে চাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মেসার্স নিউ টিপটপ ক্যাটারার্সের সদস্য রঞ্জু। তার কাছে টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এটা তাদের বগি। এখানে তারা যা খুশি তাই করবেন। তবে এই টাকা তারা একা খান না।’বিষয়টি নিয়ে জানতে কয়েকটি বগি ঘুরেও মেসার্স নিউ টিপটপ ক্যাটারার্সের ইনচার্জকে খুঁজে না পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের এক কর্মকর্তা সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘এ স্টেশন চলাচলকারী বিভিন্ন ট্রেনে প্রতিদিন গড়ে বিনা টিকিটের হাজারেরও বেশি যাত্রী পরিবহন করা হয়। সেই হিসেবে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা পকেটস্থ করছেন অসাধু রানিং স্টাফরা।’কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার খলিলুর রহমান সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘খাবার গাড়ি শুধু খাবার খাওয়ার জন্য, এছাড়া টিকিটধারী বা টিকিট ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। আপনাদের মাধ্যমে অভিযোগটি পেয়েছি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
