ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত কেরানীগঞ্জ একসময় পরিচিত ছিল শুধু তার নদী, ঘাট আর কাঁচা বাজারের জন্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এ অঞ্চলটি এখন দেশজুড়ে এবং বহির্বিশ্বেও এক অনন্য পরিচিতি গড়ে তুলেছে। ইতিহাস, শিল্প, জনশক্তি ও উদ্ভাবনী উদ্যোক্তাদের এক মোহন মিশেলে কেরানীগঞ্জ আজ এক সম্ভাবনার নাম।কেরানীগঞ্জের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে বুড়িগঙ্গা নদী, যার ওপারেই মোঘল আমলের রাজধানী ঢাকা শহর। ইতিহাসবিদদের মতে, মোঘল ও ব্রিটিশ শাসনামলে কেরানীগঞ্জ ছিল একটি বাণিজ্যিক গেটওয়ে, যার মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে বাইরের দুনিয়ার যোগাযোগ সহজতর হয়েছিল।বস্ত্রশিল্পে কেরানীগঞ্জের আন্তর্জাতিক পরিচিতি:কেরানীগঞ্জ আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাক ও বস্ত্র বিপণন কেন্দ্র। এখানে প্রায় ৫ হাজারের বেশি গার্মেন্টস ও টেইলারিং হাউস রয়েছে। কেরানীগঞ্জের তৈরি পোশাক মালয়েশিয়া, ভারত, নেপাল, সৌদি আরব, ও মধ্যপ্রাচ্য–এ রপ্তানি হয়। বিশেষ করে ঈদ উপলক্ষে দেশের বাইরেও কেরানীগঞ্জের ডিজাইনের সালোয়ার-কামিজ ও শাড়ির চাহিদা অনেক বেশি। এক কথায়: ‘কেরানীগঞ্জ মানেই এখন ফ্যাশনের ঘর!’লোহার ও ধাতব শিল্পে আধুনিকায়নকেরানীগঞ্জের জিনজিরা ও কলাতিয়া অঞ্চলে গড়ে উঠেছে শত শত ছোট ও মাঝারি ধাতব কারখানা। বিদেশ থেকে আগত পুরনো লোহা ও যন্ত্রাংশ রিসাইকেল করে তৈরি হচ্ছে গার্ডার, গেট, ট্রাংক, ফার্নিচার। এসব পণ্য ভারত, ভুটান, এমনকি আফ্রিকার কিছু দেশে এক্সপোর্ট হয়।অভিবাসী জনশক্তি ও বৈদেশিক রেমিটেন্স:কেরানীগঞ্জ থেকে হাজার হাজার মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, ও মালয়েশিয়ায় কাজ করেন। তারা বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা দেশে পাঠান, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। এ অভিবাসীরা বিদেশে নিজেদের যোগ্যতায় কেরানীগঞ্জের নাম উজ্জ্বল করে চলেছেন।নতুন প্রজন্ম ও স্টার্টআপ উদ্যোগ:কেরানীগঞ্জের তরুণরা আজ ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন ব্যবসা, এবং ফ্রিল্যান্সিং–এ অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় অনেকেই এখন ইউটিউবার, ফ্যাশন ডিজাইনার, আইটি উদ্যোক্তা। তারা দেশের বাইরের ক্লায়েন্টদের সেবা দিয়ে কেরানীগঞ্জকে অনলাইনে তুলে ধরছে।সরকারের পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন:দোহারে স্পেশাল ইকোনমিক জোন, বুড়িগঙ্গা নদী ড্রেজিং, শিকড় এক্সপ্রেসওয়ে–এর মতো প্রকল্পে সরকার সরাসরি কাজ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কেরানীগঞ্জকে ঢাকার স্যাটেলাইট সিটি হিসেবে ঘোষণা করার সম্ভাবনা রয়েছে। কেরানীগঞ্জ এখন আর শুধু ঢাকার উপশহর নয়—এটি বাংলাদেশের আত্মনির্ভরশীলতা, শিল্প ও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠছে।বহির্বিশ্বে কেরানীগঞ্জের সুনাম আরও ছড়িয়ে দিতে হলে প্রয়োজন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বিস্তার, পরিবেশবান্ধব শিল্প নীতি, নদী ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
