কক্সবাজার জেলায় স্বাস্থ্য সংকট আরও গভীর হচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ যখন প্রতিদিনই বাড়ছে, ঠিক তখনই ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর মিছিল শঙ্কার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে ম্যালেরিয়ায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন। অন্যদিকে, ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২ হাজার ৫০০ জন।সদরের ঝিলংজা এলাকার বাসিন্দা হাজী নুরুল আমিন বলেন, ‘আমার ছোট ভাই শাহেদ (৩২) ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত মাসে মারা গেছে। এখন বড় ভাই ইয়াকুব ভাইও হাসপাতালে ভর্তি। আমরা কখনও ভাবিনি, কক্সবাজারে ম্যালেরিয়ার মতো রোগে জীবন যাবে।’হাসপাতালে দেখা যায়, রোগীদের ভিড় বাড়ছে। অনেকেই জ্বর, মাথাব্যথা ও ঠাণ্ডাজনিত উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছেন। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একজন নারী রোগী আসমা খাতুন (২৬) জানালেন, ‘প্রথমে ডেঙ্গু ভেবেছিলাম। পরে টেস্টে ধরা পড়ে ম্যালেরিয়া। আমার ৮ বছরের মেয়েটাও জ্বরে কাঁপছে।’কক্সবাজার জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের কর্মকর্তা পংকজ পাল জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত কক্সবাজারে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪৩১ জন। এর মধ্যে শুধু জুন মাসের প্রথম ২৫ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ২১৬ জন। মৃত্যুর তালিকায় রয়েছে ৬ জন- যাদের ৫ জন স্থানীয় এবং একজন রোহিঙ্গা।অন্যদিকে, একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৫০৮ জন। এর মধ্যে ৩০৩ জন স্থানীয় ও ২ হাজার ২০৫ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। বিশেষ করে জুন মাসেই ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৮৫৬ জন- যার মধ্যে ৭২৬ জনই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর।জেলায় করোনার উপস্থিতিও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত ১৬ জনের মধ্যে ১১ জন রোহিঙ্গা এবং ৫ জন স্থানীয় বাসিন্দা। সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদুল হক জানান, ‘সবাই বাড়িতে আইসোলেশনে রয়েছেন। প্রতিটি উপজেলায় আইসোলেশন কেন্দ্র চালু আছে।’সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদুল হক বলেন, ‘ম্যালেরিয়ার প্রকোপ আগে কক্সবাজারে এতটা ছিল না। এটি মূলত বান্দরবনের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে এসেছে। বান্দরবন ও কক্সবাজারের মানুষের চলাচল বেশি হওয়ায় সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে, ডেঙ্গুর জন্য দায়ী পরিচ্ছন্নতার অভাব, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও জমে থাকা পানি।’তিনি আরও বলেন, ‘রোগ প্রতিরোধে নাগরিক সচেতনতা খুবই জরুরি। শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, স্থানীয় জনগণকেও সজাগ হতে হবে।’উখিয়া উপজেলার পালংখালী এলাকার মজনু মিয়া বলেন, ‘ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা অনেক সময় হাসপাতালে হয় না, ওষুধ কিনতে হয় বাইরে থেকে। দিনমজুরের কাজ করি, মেয়ের জন্য ওষুধ কিনতে দোকানে ধার করেছি।’অন্যদিকে, টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক রুবেল হোসেন জানালেন, ‘ক্যাম্পে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া নিয়ে প্রচুর রোগী আসছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় কিট, ওষুধ ও আইসোলেশন বেডের অভাব রয়েছে।’কক্সবাজারে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও করোনার একত্রে আক্রমণে একধরনের স্বাস্থ্যজরুরি অবস্থা তৈরি হয়েছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং দ্রুত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। এমনটাই মনে করেছেন সচেতন মহল। এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
