স্বপ্ন পূরণ ও পরিবারের আর্থিক মুক্তির আশায় ধারদেনা করে ১৪ লাখ টাকার বিনিময়ে দালালের মাধ্যমে রাশিয়া পাড়ি জমান। কিন্তু দালালচক্র তাদের রাশিয়া নিয়ে গেলেও তাদের কথামতো চকলেট কারখানায় কাজ না দিয়ে রাশিয়ার কাছে বিক্রি করে দেয়। বাধ্য হয়ে রুশ বাহিনীর হয়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে প্রাণ গেল নরসিংদীর পলাশের সোহান মিয়া নামে এক যুবকের।নিহত সোহান মিয়া উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের ইছাখালী গ্রামের মৃত সোহরাব মিয়ার ছেলে। পরিবারে তার মা নূরুন্নাহার ও স্ত্রী হাবিবা আক্তার এবং তাঁর ১৬ মাসের ছেলে ফারহান রয়েছে।মঙ্গলবার (২৪ জুন) সকালে পলাশ উপজেলায় অবস্থিত নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সোহানের মা নূরুন্নাহারের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। ছেলে হারানোর শোকে কিছু সময় পরপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। নিহতের স্ত্রীকে দেখা যায় ঘরের এক কোণে পড়ে আছেন বেদনায়, হতাশায়, শোকে পাথর হয়ে। তার চোখে মুখে দুশ্চিন্তা স্বামীকে হারানোর বেদনার পাশাপাশি ফুটে উঠেছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা।  জানা যায়, শনিবার (২১ জুন) বিকাল সাড়ে ৩টায় রাশিয়ায় অবস্থিত সোহানের বন্ধু সহযোদ্ধা জাফরের ফোনের মাধ্যমে সোহানের মায়ের ফোনে খবর আসে সোহান যুদ্ধে মারা গেছে। পরে ফোনে সোহানের মরদেহের ছবিও পাঠায় জাফর। রবিাবর বাদ জোহর গ্রামের বাড়ির পাশের মসজিদে তার গায়েবানা জানাজা পড়েন এলাকাবাসী।পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চাকরির আশায় বিদেশ পাড়ি জমিয়েছিলেন সোহান মিয়া ও তার বোনের জামাই আকরাম মিয়া। ইচ্ছা ছিল ইউরোপে গিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদল করবেন। সেজন্য ধারদেনা করে ১৪ লাখ টাকার বিনিময়ে দেশ ছাড়েন তারা। কিন্তু দালালচক্র তাদের রাশিয়া নিয়ে গেলেও তাদের কথামতো চকলেট কারখানায় কাজ না দিয়ে রাশিয়ার কাছে বিক্রি করে দেয়। ফলে সে দেশে গিয়ে সোহানকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার জন্য অস্ত্রের প্রশিক্ষণে নামতে হয়েছে। তবে তার বোনজামাই আকরাম মিয়া কৌশলে পালিয়ে বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থেকে বাড়ি ফিরে আসেন। আকরাম সরকারচর গ্রামের কাজল মিয়ার ছেলে।সোহানের বড় চাচা রেজাউল আলম রিপন বলেন, ঢাকার বনানীর ড্রিম হোম ট্রাভেলস থেকে জেরিন নামে এক দালালের মাধ্যমে সাইপ্রাস যাওয়ার জন্য কাগজপত্র জমা দেন তারা। কিন্তু দীর্ঘদিন পর দালাল চক্র রাশিয়ার ভিসা করে দেন তাদের। পরে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ১০ জনের একটি দল রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়।‘রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সেখানে তাদের ৪ দিন রাখে। কিন্তু সোহানসহ আরও দু’জনকে একদিন পরই সেখান থেকে নিয়ে যায় রাশিয়ার সেনা ক্যাম্পে। নিয়েই শুরু হয় দালাল চক্রের অত্যাচার। যুদ্ধের প্রশিক্ষণে যেতে সামরিক পোশাক দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ নিতে না চাইলে দেওয়া হয় হত্যার হুমকি। করা হয় মারধর, দেওয়া হয় না খাবার। পরে সোহান আকরামকে এগুলো জানায় এবং সেখান থেকে পালিয়ে যেতে বলে। সোহানের দু’দিন পরে আকরামেরও যাওয়ার কথা ছিল। পরে সেখান থেকে আকরাম পালিয়ে গিয়ে বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করে দেড় লাখ টাকা নিয়ে টিকিট কেটে গত ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ ফিরে আসে।’কান্না জড়িত কণ্ঠে সোহানের মা জানান, ধারদেনা করে ৭ লাখ টাকা দিয়ে তাঁর একমাত্র ছেলেকে বিদেশে পাঠানো হয়। দালাল চক্র সোহানকে রাশিয়ায় সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে নামিয়ে ছিল তার সন্তানকে। সংসারের একমাত্র উপার্জনশীল সোহান।তিনি আরো বলেন, ‘এখন আমি কি করবো। যুদ্ধ চলাকালে মাঝে মাঝে তার সাথে কথা হতো, সে সারাক্ষণ কান্না করতো দেশে আসার জন্য। তার বন্ধু জাফর আমাকে জানায়, সোহানের শরীরে বোমা বিস্ফোরণ হলে সে মারা যায়। আমি দালালদের গ্রেপ্তারসহ বিচার চাই। আর যেন তাদের খপ্পরে পড়ে কোন মায়ের বুক খালি না হয়। সরকারের কাছে তার ছেলের মরদেহ ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন তিনি।সোহানের স্ত্রী হাবিবা আক্তার জানান, আমার স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে ড্রিম হোম ট্রাভেলসে যোগাযোগ করা হয়েছে অনেকবার। পুনরায় আড়াই লাখ টাকা দিয়ে বলেছিল জানুয়ারি ২৬ তারিখ সোহানকে এনে দিবে। কিন্তু তার বদলে সে এখন লাশ হয়ে বিদেশের মাটিতে পড়ে রয়েছে।হাবিবা অভিযোগ করে বলেন, আমরা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়েও যোগাযোগ করেছি, তারাও কিছুই করলো না। এখন আমার ১৬ মাসের শিশু সন্তানকে নিয়ে কিভাবে বাঁচবো। আমি দালালদের বিচার ও শাস্তি চাই। সরকারের কাছে দাবি জানাই আমার স্বামীর লাশ যেন দেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে।পলাশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করলে আমরা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সোহানের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবো। তার পরিবারের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরণের সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন তিনি।এসকে/এইচএ 

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
সবজির দাম কমলেও বেড়েছে ডিম-মাংসের দাম
সবজির দাম কমলেও বেড়েছে ডিম-মাংসের দাম

রাজধানীতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সবজির দাম বাড়তি গেলেও আজ বাজারে সবজির দাম কিছুটা কমেছে। ৭০ থেকে ৮০ টাকার ঘরে Read more

মুস্তাফিজ ইস্যুতে বিসিবির জরুরি বোর্ড সভা
মুস্তাফিজ ইস্যুতে বিসিবির জরুরি বোর্ড সভা

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) প্রথমবার কলকাতা নাইট রাইডার্সের দলে ডাক পেয়েছিলেন বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। তবে চাপের মুখে বিসিসিআইয়ের এক Read more

‘১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে, একদিন আগেও না পরেও না’
‘১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে, একদিন আগেও না পরেও না’

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে বলে দৃঢ় আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।তিনি Read more

১৩৩টি অধ্যাদেশই বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হবে
১৩৩টি অধ্যাদেশই বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হবে

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশই বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত সংসদীয় বিশেষ Read more

গাজা যুদ্ধ নিয়ে শান্তি আলোচনা শুরু হচ্ছে মিশরে
গাজা যুদ্ধ নিয়ে শান্তি আলোচনা শুরু হচ্ছে মিশরে

গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের প্রতিনিধিদের মধ্যে কায়রোতে আগামী ৬ অক্টোবর আলোচনা শুরু করবে মিশর। বৈঠকের প্রধান বিষয় হবে Read more

ট্রান্সফরমার বিকল: ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত সাতকানিয়া
ট্রান্সফরমার বিকল: ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত সাতকানিয়া

৩৩/১১ কেভি বিদ্যুৎ উপ-কেন্দ্রের একটি ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে যাওয়ার পর থেকে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে নাকাল হয়ে পড়েছেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কয়েক Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন