নিম্নচাপের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সাগর যখন উত্তাল, তখন তার বুকে ভেসে বেড়ানো কিছু পরিত্যক্ত নৌযান যেন প্রকৃতির এই ক্রোধের শিকার হয়ে ধরা পড়ল উপকূলের বালুকাবেলায়। বৃহস্পতিবার (৩০ মে) রাতভর চলা প্রবল ঝোড়ো হাওয়া ও সাগরের ভয়ঙ্কর ঢেউয়ের মুখে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও আনোয়ারা উপকূলে চারটি নৌযান তীরে উঠে পড়ে।চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমার আওতাধীন আনোয়ারা উপকূলে আটকা পড়া দুটি নৌযান হলো—বার্জ মারমেইড-৩ এবং এর সহযোগী টাগবোট নাভিমার-৩। দীর্ঘদিন ধরে একটি আইনি জটিলতার কারণে এসব নৌযান চট্টগ্রাম উপকূলে নোঙর করে রাখা হয়েছিল। অবশেষে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া তাদের তীরে এনে ফেলল—একটি অনাকাঙ্ক্ষিত স্থলে, এক অনিশ্চিত পরিণতির মুখে।প্রায় দুই বছর আগে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য ভারত থেকে পাথর বহন করে আনা হয়েছিল বার্জ মারমেইড-৩-তে। সহযোগী টাগবোট নাভিমার-৩ ছিল নৌযানটির পথপ্রদর্শক। কিন্তু যাত্রার পর থেকেই শুরু হয় জটিলতা। জ্বালানি সরবরাহ, অপারেশনাল খরচসহ নানা আর্থিক বিষয়ে মালিকপক্ষ কোনো দায় স্বীকার করেনি। এ নিয়ে স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান ভিশন শিপিং কোম্পানি—যারা চট্টগ্রামে নৌযান দুটির দেখভাল করছিল—তারা পায়নি কোনো বিল বা ক্ষতিপূরণ।ভিশন শিপিংয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, ‘জাহাজ দুটির মালিকপক্ষের কোনো সাড়া নেই। অথচ আমরা নিয়মিত চারজন ওয়াচম্যান দিয়ে জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যাচ্ছি। এই অবস্থায় আমাদের জন্য এটি শুধুই বোঝা।’নৌযান পাহারার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মী মিসকাতুর রহমান জানান, ‘বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ করেই সাগর উত্তাল হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড ঢেউয়ের মুখে পড়ে নিয়ন্ত্রণ হারায় জাহাজ দুটি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা তীরে গিয়ে আটকে যায়।’একই রাতে চট্টগ্রামের আরেক প্রান্ত পতেঙ্গা উপকূলেও ঘটে এক অনুরূপ ঘটনা। সাগরের তাণ্ডবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুটি পণ্যবাহী জাহাজ—এমভি আল-হেরেম ও বিএলপিজি সুফিয়া—তীরে এসে আটকে পড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব জাহাজ চলাচলের অনুমতিসহ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।আইন ও নৌ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর গত সপ্তাহজুড়েই উপকূলীয় এলাকাগুলোতে নিম্নচাপ সৃষ্টির আশঙ্কা ও সম্ভাব্য ঝোড়ো হাওয়ার বিষয়ে সতর্কতা দিয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেতও জারি ছিল। কিন্তু এসব উপকূলীয় অঞ্চলে নোঙর করে রাখা পরিত্যক্ত বা অচল নৌযানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা ছিল বলে মনে হয় না।আনোয়ারায় আটকে পড়া মারমেইড-৩ ও নাভিমার-৩ সংক্রান্ত আর্থিক জটিলতা নিয়ে ইতোমধ্যে পাঁচটি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে নৌযান দুটি অনিরাপদ অবস্থায় পড়ে ছিল সাগরে। এমন জাহাজগুলো বন্দরের জলসীমায় নোঙর করে রাখার আগে মালিকপক্ষ ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের দায়-দায়িত্ব স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা উচিত।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
