চট্টগ্রামের নগর পরিকল্পনার ইতিহাসে দীর্ঘদিনের এক অব্যবস্থাপনার অধ্যায় অবসানের দ্বারপ্রান্তে। প্রায় দেড় দশক ধরে আটকে থাকা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) দুটি বৃহৎ আবাসন প্রকল্প– ‘ডেভেলপমেন্ট অব ফতেয়াবাদ নিউ টাউন’ এবং ‘বে ভিউ স্মার্ট সিটি’– নতুন করে পর্যালোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য অংশ রাখা এবং বাকি জমি উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পথে অগ্রসর হচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক বা সিডিএ)।প্রকল্প দুটি কাগজে-কলমে ঘোষণার পর থেকেই স্থানীয়দের কাছে এক সময় আশার আলো হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এগুলো রূপ নিয়েছে হতাশা ও দুর্ভোগের প্রতীকে। উন্নয়ন কাজ এগোয়নি, নতুন কোনো অবকাঠামো নির্মাণের অনুমোদন মেলেনি, আর জমির মালিকরা বছরের পর বছর নিজেদের সম্পত্তি ব্যবহার বা বিক্রি করার সুযোগ হারিয়েছেন। এখন, সিডিএ’র সর্বশেষ উদ্যোগ স্থানীয়দের জন্য আশার সঞ্চার করেছে।দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের ফতেয়াবাদ এলাকা– পাহাড়ের সবুজ ছায়া, শহরের কোলাহল, সেনানিবাসের সুরক্ষা আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ– সব মিলিয়ে এক সম্ভাবনাময় নগর উপশহর। ২০০৭ সালে সিডিএ এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে ‘ডেভেলপমেন্ট অব ফতেয়াবাদ নিউ টাউন’ প্রকল্প হাতে নেয়। প্রথমে ৪ হাজার ৭০০ একর জমি নির্ধারণ করা হয়, যা ২০১৩ সালের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) বাড়িয়ে ৭ হাজার একর করা হয়।ড্যাপ ছিল নগরের উন্নয়ন পরিকল্পনার রূপরেখা, যেখানে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয় কোন এলাকায় আবাসিক, শিল্প, জলাধার, সবুজায়ন ও সড়ক থাকবে। পরিকল্পনার নিয়ম অনুযায়ী, শিল্পাঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় আবাসিক ভবন নির্মাণ অনুমোদিত নয় এবং বিপরীতটিও নিষিদ্ধ। কিন্তু এত স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি এক দশকেও আলোর মুখ দেখেনি।প্রকল্পের কারণে প্রায় দুই লাখ বাসিন্দা দীর্ঘ সময় ধরে নানামুখী সমস্যায় ভুগছেন। নতুন কোনো ঘরবাড়ি নির্মাণের প্ল্যান অনুমোদন বন্ধ থাকায় কেউ নিজের বাড়ি সম্প্রসারণ করতে পারেননি। আবার অনেকে মেয়ের বিয়ে, চিকিৎসা খরচ, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা বিদেশে পাঠানোর জন্য জমি বিক্রি করতে চেয়েও পারেননি। ফলে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে।স্থানীয় বাসিন্দারা একাধিকবার সংগঠিত হয়ে আন্দোলন করেছেন, রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হয়েছেন, সিডিএ কার্যালয়ে ধর্ণা দিয়েছেন—কিন্তু সুরাহা হয়নি।হাটহাজারী ভূমি অফিসের তথ্য বলছে, দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজায় ভিটা জমির প্রতি শতকের সরকারি দাম ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮৭০ টাকা। হুকুম দখলে আইন অনুযায়ী এই দাম তিন গুণে দাঁড়ায় কাঠাপ্রতি ৪২ লাখ ৯৪ হাজার ৩৫০ টাকা। উন্নয়ন ব্যয় যোগ করলে প্রতি কাঠার দাম দাঁড়াবে ৬০ লাখ টাকারও বেশি।এভাবে, নাল জমি অধিগ্রহণ করলেও প্রতি কাঠার দাম পড়বে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। স্থানীয়দের মতে, শহরের প্রান্তে এত উচ্চ মূল্যে প্লট বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব, ফলে প্রকল্পের অর্থনৈতিক টেকসইতা প্রশ্নবিদ্ধ।অন্যদিকে, পতেঙ্গায় আউটার রিং রোড সংলগ্ন সাগরপাড়ে সিডিএর ‘বে ভিউ স্মার্ট সিটি’ প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল পর্যটন, বাণিজ্যিক এবং আবাসিক সুযোগ-সুবিধা সমন্বিত আধুনিক নগর গড়ে তোলার লক্ষ্যে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও তা পরিকল্পনার গণ্ডি পেরোতে পারেনি। ফলে এখানকার জমিও বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে।দীর্ঘ জট কাটাতে সিডিএর বোর্ড সদস্য মানজারে খোরশেদকে প্রধান করে একটি ৮ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বোর্ড সদস্য জেরিনা হোসাইন, স্থপতি ফারুক আহমেদ, প্রকৌশল বিভাগের চারজন কর্মকর্তা এবং উপ–প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনসারি– যিনি সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।কমিটি ইতোমধ্যে বৈঠক করে অ্যাকশন প্ল্যান প্রস্তুত করেছে এবং শিগগির পূর্ণমাত্রায় কাজ শুরু করবে। তাদের দায়িত্ব হলো– প্রকল্পগুলোর যৌক্তিকতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যাচাই করা, প্রয়োজনীয় অংশ রেখে বাকি জমি উন্মুক্ত করা এবং উন্নয়ন গাইডলাইন প্রস্তুত করা। এই গাইডলাইনে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ থাকবে কোন এলাকায় আবাসিক, কোন এলাকায় বাণিজ্যিক বা পর্যটন কেন্দ্রিক স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে।সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ নুরুল করিম সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, ‘বহুদিন ধরে জায়গাগুলো আটকে আছে, মানুষ কিছু করতে পারছে না। আমরা চাই, পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার পাশাপাশি জনদুর্ভোগ দূর করতে। ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে যাচাই করা হবে আবাসিক এলাকা করা যুক্তিযুক্ত হবে কিনা, আর হলেও কতটুকু জমি লাগবে। বাকি জমি উন্মুক্ত করা হবে। তবে গাইডলাইন মেনে চলতে হবে– কোথায় বাড়িঘর, কোথায় বাণিজ্যিক বা পর্যটন স্থাপনা হবে তা নির্দিষ্ট থাকবে।’তিনি আরও জানান, পতেঙ্গার জমি ব্যবহারে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আলোচনা হবে, যাতে বন্দরের ভবিষ্যৎ প্রয়োজন ও নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা সমন্বয় করা যায়।প্রায় ১৫ বছরের অনিশ্চয়তার পর, ফতেয়াবাদ ও পতেঙ্গার জমি উন্মুক্তের সম্ভাবনা স্থানীয়দের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে এটি কেবল জনদুর্ভোগ কমাবে না, বরং চট্টগ্রামের নগরায়ণে নতুন মাত্রা যোগ করবে।স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ‘যদি এ উদ্যোগ সফল হয়, তাহলে শুধু জমি নয়– আমাদের জীবনেরও নতুন দুয়ার খুলবে।’এইচএ

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
ইউক্রেন-রাশিয়ার পাল্টাপাল্টি হামলায় নিহত অন্তত ৭
ইউক্রেন-রাশিয়ার পাল্টাপাল্টি হামলায় নিহত অন্তত ৭

প্রায় অর্ধশত মিসাইল আর ৬শ’ ড্রোন নিয়ে ইউক্রেনে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। বিমান হামলার শিকার হয়েছে দেশটির ৯টি অঞ্চল।ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট Read more

বিস্ফোরণ মামলায় অব্যাহতি পেলেন ফখরুলসহ ৬৫ জন
বিস্ফোরণ মামলায় অব্যাহতি পেলেন ফখরুলসহ ৬৫ জন

ঢাকার রমনা মডেল থানার বিস্ফোরক আইনের মামলায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ৬৫ জনকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত।বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) Read more

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় জামালপুরের টোকন নিহত
সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় জামালপুরের টোকন নিহত

সৌদি আরবের জেদ্দায় সড়ক দুর্ঘটনায় নজরুল ইসলাম টোকন (৪৫) নামে এক বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) সৌদি আরবের Read more

চোখের সামনে মৃত্যু দেখে দম বন্ধ লাগছে: মাহিয়া মাহি
চোখের সামনে মৃত্যু দেখে দম বন্ধ লাগছে: মাহিয়া মাহি

ঈদের আনন্দের মাঝেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকা মাহিয়া মাহির জীবনে। ঈদের রাতে খুব কাছের এক ছোট Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন