গত বছরের ১৮ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় লাগা সেই ভয়াবহ আগুনের স্মৃতি এখনো জনমনে টাটকা। দীর্ঘ ২৭ ঘণ্টার তাণ্ডব শেষে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও রেখে গিয়েছিল ছাই আর পোড়া মালামালের বিশাল এক স্তূপ। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই ধ্বংসস্তূপই এখন হয়ে উঠেছে এক বিকল্প অর্থনীতির উৎস। বিমানবন্দরের সেই পোড়া বর্জ্য বা ছাইয়ের মূল্য এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা।সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত মালামালগুলো একটি সুসংগঠিত বাণিজ্যিক চক্রের মাধ্যমে হাতবদল হচ্ছে। শুরুতে প্রায় ৫০ লাখ টাকায় এই পোড়া মালামাল কিনে নেন একজন বড় ব্যবসায়ী। এরপর কয়েক দফা হাতবদল হয়ে তা পৌঁছায় তৃতীয় পক্ষের কাছে। এই তৃতীয় পক্ষই মূলত ধ্বংসস্তূপ থেকে মূল্যবান সম্পদ উদ্ধারের মূল কারিগর।পোড়া বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু খুঁজে বের করতে দিনরাত কাজ করছেন একদল অভিজ্ঞ শ্রমিক। তাদের কাজের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধৈর্য ও কৌশলের, প্রথমে বিশাল স্তূপ থেকে পোড়া বর্জ্য সংগ্রহ করে তা পানিতে ভালোভাবে ধোয়া হয়।ধোয়ার পর সেখান থেকে লোহা, পিতল, দস্তা ও সিলভারের মতো মূল্যবান ধাতব অংশ আলাদা করা হয়। প্রাপ্ত ধাতব অংশগুলো গলিয়ে বিশেষ ‘বাধ’ তৈরি করা হয়। এই ‘বাধ’গুলো ঢাকার বিভিন্ন কারখানায় পাঠানো হয়, যেখানে এগুলো থেকে তৈরি হয় নতুন নতুন কাঁসা ও পিতলের পণ্য।এই কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক প্রতিদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছেন। তাদের অনেকেই বংশপরম্পরায় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। শ্রমিকরা জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই কঠিন সময়ে দৈনিক ৮০০ টাকা হাজিরায় কাজ করে তাদের সংসার চলছে এই পোড়া মালামালের ওপর ভিত্তি করেই। ধ্বংসস্তূপ থেকে সম্পদ খুঁজে বের করার বিশেষ পারদর্শিতা এখন তাদের প্রধান জীবিকায় পরিণত হয়েছে।ব্যবসায়ীরা জানান, লোহা জাতীয় পদার্থগুলো সরাসরি পাইকারদের কাছে বিক্রি করা গেলেও পিতল বা সিলভারের মতো ধাতুগুলো থেকে লাভের মুখ দেখতে সময় লাগে। পুরো প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষ করে চূড়ান্ত বিক্রয়যোগ্য করতে প্রায় তিন মাসের মতো সময়ের প্রয়োজন হয়।”বিমানবন্দরের সেই ধ্বংসাবশেষ একদিকে যেমন জাতীয় ক্ষতির চিহ্ন বহন করছে, অন্যদিকে এর পুনর্ব্যবহার অপচয় কমাতে সাহায্য করছে। এই কর্মযজ্ঞ বহু মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।স্থানীয় এক প্রক্রিয়াজাতকারী ব্যবসায়ীঅগ্নিকাণ্ডের মতো ট্র্যাজেডি থেকে সৃষ্ট এই ‘বর্জ্য অর্থনীতি’ একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ রোধ করছে, অন্যদিকে কাঁচামাল আমদানির ওপর চাপ কমিয়ে স্থানীয় শিল্পকে জোগাচ্ছে নতুন রসদ। ধ্বংসস্তূপের ছাই থেকে কোটি টাকার বাণিজ্য এখন শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্স এলাকার এক নতুন বাস্তবতা।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
