দুপুরের তপ্ত রোদে যখন বিরামপুরের রাস্তাগুলো খাঁ খাঁ করে, তখন প্যাডেল চালিত একটি আইসক্রিম ভ্যান নিয়ে ধীরলয়ে এগিয়ে চলে ১৪ বছরের এক কিশোর। সমবয়সীরা যখন কাঁধে স্কুলব্যাগ ঝুলিয়ে শ্রেণিকক্ষে ঢোকে, মেহেদী তখন আইসক্রিম বাক্সের ঘণ্টি বাজিয়ে খদ্দের খোঁজে। তার কপালে জমে থাকা ঘাম আর রোদে পোড়া মুখটি যেন আমাদের সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শৈশবের এক জীবন্ত দলিল।বিরামপুর পৌরশহরের কল্যাণপুর গ্রামের মেহেদী হাসানের গল্পটি কেবল দারিদ্র্যের নয়, বরং চরম একাকীত্বেরও। জন্মের পরই বাবা লোকমান হোসেনকে হারায় সে। মা অন্য সংসারে পাড়ি জমালে মেহেদীর আশ্রয় হয় নানী জাহানারা খাতুনের জীর্ণ কুটিরে। চরম অর্থকষ্টের মাঝেও বিরামপুর পৌরসভা দাখিল মাদ্রাসা থেকে ইবতেদায়ী শেষ করেছিল সে, কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর দারিদ্র্যের শিকল তার স্কুলের পথ আটকে দেয়।একসময় রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটত মেহেদী। কিন্তু শরীর সায় না দেওয়ায় এখন আইসক্রিম বিক্রিকেই বেছে নিয়েছে। প্রতিদিন ভোরে নানীর কাজে সাহায্য করে আইসক্রিমের ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে। উপজেলার মেঠোপথ আর চেনা স্কুলগুলোর সামনে দিয়ে যখন সে যায়, তার বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে।আইসক্রিম বিক্রির ফাঁকে বিরামপুরের দোয়েল স্টুডিও মোড়ে কথা হয় মেহেদীর সাথে। লাজুক হেসে সে বলে,”স্কুলের সামনে দিয়া যখন যাই, খুব মনে পড়ে বন্ধুদের কথা। সুযোগ পাইলে আমি আবার পড়ালেখা করতাম। বড় হওয়ার খুব ইচ্ছা আমার।”দিন শেষে যা সামান্য আয় হয়, তা তুলে দেয় নানীর হাতে। নানী জাহানারা খাতুন ঝাপসা চোখে বলেন, “অনেক চেষ্টা করছি নাতিডারে পড়াইতে, কিন্তু পেটের ভাত জোটানোই তো দায়। ওর পড়ার খুব শখ, কিন্তু আমি অপারগ।”মেহেদীর এই আকুতি পৌঁছাতে শুরু করেছে সহৃদয় মানুষদের কানে। বিরামপুর পৌরসভা দাখিল মাদ্রাসার সুপার গোলাম মাওলা আশ্বাস দিয়েছেন, মেহেদী ফিরতে চাইলে প্রতিষ্ঠান থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। তবে কেবল প্রতিষ্ঠান নয়, মেহেদীর মতো স্বপ্নবাজ কিশোরদের স্থায়ীভাবে স্কুলে ফেরাতে প্রয়োজন সমাজের বিত্তবান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হাত।একটি বই, একটি খাতা আর একটুখানি মমতা হয়তো বদলে দিতে পারে মেহেদীর জীবন। আইসক্রিমের ঘণ্টি নয়, মেহেদী আবার ফিরুক স্কুলের ঘণ্টার শব্দে—বিরামপুরের আকাশে এখন এটাই বড় প্রার্থনা।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
