মেক্সিকোর উত্তরে চিহুয়াহুয়া প্রদেশের আভেন্দানোস গুহায় ২০১৬ সালের এক অবিশ্বাস্য আবিষ্কারে উত্তেজিত প্রত্নতাত্ত্বিক মহল। সেখানে উদ্ধার হয়েছে এক শিশুর কঙ্কাল, একজন পুরুষের কোমর থেকে নিচের অংশ—যার পা শক্ত করে বাঁধা ছিল—এবং প্রায় দুই হাজার বছর আগের এক আমেরিকান টিয়াপাখি, অর্থাৎ ম্যাকাওর মমি। উদ্ধারের ৯ বছর পরে ২০২৫ সালে এসেও এটি নিয়ে গবেষকরা নানা মত দিচ্ছেন।গবেষকদের মতে, তিনটি নিদর্শন শুধু সময়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা রহস্যই উন্মোচন করছে না, বরং প্রাচীন আমেরিকার সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়েওও দিচ্ছে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।ঘটনার সূচনা ২০১৬ সালে। টেক্সাস সীমান্ত থেকে প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এক খামারের মালিক তার জমির গুহায় সংস্কার কাজ শুরু করেন। শ্রমিক ও বুলডোজার দিয়ে কাজ চলছিল, ঠিক তখনই গুহার ভেতর মাটির নিচে তারা খুঁজে পান কিছু অদ্ভুত অবয়ব ও হাড়গোড়। প্রথমে এগুলোকে সাধারণ জীবাশ্ম ভেবে গুরুত্ব না দিলেও, কিছুক্ষণ পর স্পষ্ট হয়—এটি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক বিস্ময়।খামারমালিক কাজ বন্ধ করে দেন এবং আবিষ্কৃত বস্তুগুলোর ছবি পাঠান মেক্সিকোর জাতীয় নৃতত্ত্ব ও ইতিহাস ইনস্টিটিউটের পরিচালক, খ্যাতনামা প্রত্নতত্ত্ববিদ এমিলিয়ানো গালাগারের কাছে। সঙ্গে সঙ্গে গবেষক দলের সদস্যরা সেখানে পৌঁছে নমুনা সংগ্রহ ও বিস্তারিত খনন কাজ শুরু করেন।বিশ্লেষণে দেখা যায়, ম্যাকাও পাখিটির মমি অত্যন্ত ভালোভাবে সংরক্ষিত ছিল—তার পালক, ঠোঁট এমনকি চোখের অংশও প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি প্রাণীর এমন সংরক্ষণ বিরল ঘটনা, বিশেষত উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ার এলাকায়।গবেষকদের মতে, ম্যাকাও পাখিটি সম্ভবত দূর দক্ষিণের ট্রপিক্যাল অঞ্চল—সম্ভবত বর্তমান হন্ডুরাস বা বেলিজ অঞ্চল থেকে আনা হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে, দুই হাজার বছর আগেই উত্তর মেক্সিকোর সঙ্গে মধ্য আমেরিকার মধ্যে সক্রিয় বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। এই পাখিটি স্থানীয়দের কাছে হয়তো ধর্মীয় প্রতীক বা আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতিচ্ছবি হিসেবে পূজিত হতো।অন্যদিকে, শিশুর কঙ্কাল ও বাঁধা পায়ের সেই পুরুষের অবশেষ মানববলির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন কিছু বিশেষজ্ঞ। তাদের ধারণা, গুহাটি হয়তো কোনো আচার বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কেন্দ্র ছিল, যেখানে মানুষ ও প্রাণী উৎসর্গ করা হতো দেবতাদের উদ্দেশ্যে।এই আবিষ্কার নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলছেন, এটি শুধু মেক্সিকোর নয়, গোটা আমেরিকার প্রাচীন ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি আমাদের জানায়, প্রায় দুই হাজার বছর আগে এই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষরা কতটা সংগঠিত, সংস্কৃতিমনা ও ধর্মবিশ্বাসে দৃঢ় ছিল।গুহাটিতে আরো পাওয়া গেছে হাড়ের তৈরি অলংকার, মাটির পাত্র ও বস্ত্রের টুকরো—যা নির্দেশ করছে একটি জটিল ও উন্নত সংস্কৃতির উপস্থিতি। গবেষক এমিলিয়ানো গালাগার বলেন, ‘এই গুহা আমাদের অতীতের সঙ্গে এক জীবন্ত সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। এখানে পাওয়া প্রতিটি হাড়, প্রতিটি পালক, আমাদের বলে যায় দুই হাজার বছর আগেও মানুষ কেমন করে জীবন, ধর্ম আর প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছিল।’বর্তমানে এসব নিদর্শন সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য মেক্সিকো সিটির জাতীয় জাদুঘরে স্থানান্তর করা হয়েছে।সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকএবি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
