পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য হলো ভাত। ধান থেকে চাল, চাল থেকে ভাত। ভাত ছাড়া এশিয়া অঞ্চলের মানুষের চলেই না। বিশেষ করে বাংলাদেশিদের বেশিরভাগ মানুষের অভ্যাস তিনবেলা ভাত খাওয়ার। কিন্তু সম্প্রতি কিছু গবেষণায় এমন এক তথ্য উঠে এসেছে যা আমাদের চিরচেনা এই খাবারের প্রতি নতুন করে ভাবাচ্ছে। সম্প্রতি একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রতিবেদনে চালের ভেতর আর্সেনিকের উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশের মানুষ চালের ওপর নির্ভর করে, তাদের জন্য বিষয়টি সত্যিই চিন্তার।চলতি বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘হেলদি বেবিস ব্রাইট ফিউচারস’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল “হোয়াট’স ইন ইয়োর ফ্যামিলি’স রাইস?” এই গবেষণায় চালের ভেতরে থাকা ভারী ধাতব উপাদান পরীক্ষা করে দেখা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বাজার থেকে সংগৃহীত ১৪৫টিরও বেশি চালের নমুনায় উচ্চমাত্রার আর্সেনিক পাওয়া যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।চালে আর্সেনিকের উপস্থিতি নতুন কোনো সমস্যা নয়। বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা চালে বিষাক্ত এই রাসায়নিকের উপস্থিতি কমানোর উপায় খুঁজে পেতে কাজ করছেন। প্রায় সব চালেই আর্সেনিক থাকে। আর্সেনিক একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক। মাটি, পানি, বায়ু—সব জায়গাতেই আর্সেনিক থাকে। এটি মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ধান চাষ করার সময় জমিতে আর্সেনিক জমা হয় এবং গাছের মাধ্যমে মাটি থেকে আর্সেনিক চালে প্রবেশ করে।আর্সেনিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি: আর্সেনিক হলো এক ধরনের প্রাকৃতিক উপাদান যা মাটি ও পানিতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে অজৈব আর্সেনিক সবচেয়ে ক্ষতিকর। যখন কৃষিজমিতে আর্সেনিক-দূষিত পানি ব্যবহার করা হয়, তখন ধান গাছ সেই পানি শোষণ করে নেয় এবং আর্সেনিক জমা হয় চালের দানায়। যেহেতু ধান চাষের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে জমি পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়, তাই অন্য শস্যের তুলনায় ধানে আর্সেনিকের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়।পুষ্টিবিদ মালিনা মালকানি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শরীরে অল্প অল্প করে আর্সেনিক জমা হলে তা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর ফলে নানা ধরনের জটিল রোগ হতে পারে, যেমন:শিশুদের জন্য ঝুঁকি: আর্সেনিকযুক্ত খাবার শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা তাদের শেখার ক্ষমতা এবং মনোযোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।তবে কি ভাত খাওয়া বন্ধ করতে হবে? আর্সেনিকের ভয়াবহতা থেকে এখন অনেকেই ভাবতে পারেন ভাত খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে কিনা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাত খাওয়া একেবারেই ছেড়ে দেয়ার দরকার নেই। তবে কিছু সহজ উপায় মেনে চললে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। এগুলো হলো:রান্নার পদ্ধতি বদলান: ভাত রান্নার সময় প্রচুর পানি ব্যবহার করুন এবং রান্না শেষে ভাতের মাড় ফেলে দিন। এতে চালের প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ আর্সেনিক বের হয়ে যায়।চালের ধরন বেছে নিন: বাসমতি বা জেসমিন চালের মতো কিছু চালে তুলনামূলকভাবে আর্সেনিক কম থাকে। তাই খাদ্যতালিকায় এগুলো রাখুন।খাবারে বৈচিত্র্য আনুন: শুধু ভাতের ওপর নির্ভর না করে, মাঝে মাঝে কোইনোয়া, বার্লি, গম বা ভুট্টাজাতীয় খাবার খান। এতে শরীরে আর্সেনিক জমার সুযোগ কমে যাবে।শাক-সবজি বেশি খান: আঁশযুক্ত খাবার শরীর থেকে ক্ষতিকর উপাদান বের করে দিতে সাহায্য করে।আর্সেনিক-ঝুঁকি নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। সমস্যার মূল সমাধান হলো নিরাপদ পানি দিয়ে চাষাবাদ করা। পাশাপাশি সরকারেরও উচিত এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। মনে রাখতে হবে, আর্সেনিকের ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না, বরং ধীরে ধীরে তা শরীরে প্রভাব ফেলে। তাই সচেতন হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।এইচএ
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
