প্রজন্মের পর প্রজন্মকে তেভাগা থেকে ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী স্বাধীনতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের গল্প জানাতে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পাড়িয়া সালডাঙ্গা গ্রামে শহিদ কমরেড কম্পরাম সিংহের স্মরণে স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।১৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত কম্পরাম স্মৃতি কমপ্লেক্সটি সীমান্ত এলাকার মানুষের শিক্ষা, গবেষণা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে অগ্রণী ভূমিকা রাখার কথা ছিল। কিন্তু উদ্বোধনের পর থেকে কিছুদিন উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়নে থাকলেও এখন আর কোন কার্যক্রম নেই। ফলে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে কম্পরাম স্মৃতি কমপ্লেক্সটি।সালডাঙ্গা গ্রামে নির্মিত ওই কমপ্লেক্সের সব দায়িত্ব চেপে বসেছে কম্পরামের ওয়ারিশ দিনমজুর নাতি আরশি লালের উপর। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা, কমপ্লেক্সটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, রাতে পাহাড়া দেওয়া, এমনকি কেউ দেখতে গেলে কাজ ফেলে এসে তাকে সময় দেওয়া—এমন দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তাকে। প্রায় আড়াই বছরে গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে নানার স্মরণে নির্মিত শহিদ কমরেড কম্পরাম সিংহের স্মৃতি কমপ্লেক্সটি।কমপ্লেক্সটির বিদ্যুৎ বিল বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নামে থাকলেও গেল দুই বছরের বিদ্যুৎ বিল নাতি আরশি লালকে পরিশোধ করতে হয়েছে। গেল ছয় মাসের বিদ্যুৎ বিল বাকি রয়েছে প্রায় ৩ হাজার টাকার মতো। অল্প আবাদ করা পাট বিক্রি করে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের পরিকল্পনা করছেন তিনি।আফসোস করে আরশি লাল জানান, নানার মৃত্যু ৭৩ বছর স্মৃতি কমপ্লেক্সটি যখন নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিপুল কুমার। অনেক আশা আর স্বপ্ন বুনেছিলাম, দীর্ঘদিন পরে হলেও নানার বড় ত্যাগের একটা স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছি। কিন্তু ছয় মাস যাওয়ার পরেই সেই স্বপ্ন এখন গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা নিরুপায় হয়ে গেছি।তিনি অভিযোগ করে বলেন, ইউএনও বিপুল কুমার বদলি হয়ে যাওয়ার পর পরবর্তী ইউএনও আফসানা কাওসার ও পলাশ কুমার দেবনাথের নিকট একাধিকবার গেছি শুধু বিদ্যুৎ বিলের টাকা জন্য, কিন্তু দেয়নি। আড়াই বছরে এখন দরজা নষ্ট, রং উঠে গেছে, চারপাশে নির্মিত বেড়াগুলো ভেঙে গেছে। এসব ঠিক করতে অনেক টাকা প্রয়োজন। ছয় মাসের বিদ্যুৎ বিলই দিতে পারছি না।কম্পরামের নাতি আরশি লালের মেয়ে কলেজপড়ুয়া জৌতি রানী বলেন, বাবা আমার পড়ালেখার খরচ যোগাতেই হিমসিম খাচ্ছে। এরপরে কমপ্লেক্সটি ঘাড়ে চেপে বসেছে। বাবা নিরুপায় হয়ে দেখাশোনা করতে বাধ্য হচ্ছেন।স্থানীয়রা বলছেন, শহিদ কম্পরামের ত্যাগের কথা বিবেচনা করে হলেও স্মৃতি কমপ্লেক্সটি দেখাশোনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ন্যূনতম একটি খরচ বহন করার দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের।স্থানীয় সাংবাদিক মাজেদুল ইসলাম হৃদয় বলেন, শুধুমাত্র শহিদ কম্পরামের স্মৃতি কমপ্লেক্সটি নয়, উপজেলাটিতে সরকারি অর্থে ব্যয় করে নির্মিত অনেক প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। প্রকল্পের নামে অপব্যয় হয়েছে। এসব তদারকির প্রয়োজন।জানতে চাইলে সদ্য যোগদান করা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মফিজুর রহমান বলেন, খোঁজ খবর নিতে হবে। এমন অবস্থা হলে নির্ধারিত মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দের জন্য লিখবো।উল্লেখ্য, কম্পরাম সিংহ ১৮৮৭ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পাড়িয়া ইউনিয়নের সালডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪০ সালে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৪৬ সালে ডিসেম্বরে শুরু হয়ে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত চলে তেভাগা আন্দোলন। বর্গা বা ভাগ চাষিরা এতে অংশ নেয়। মোট উৎপন্ন ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ পাবে চাষি, এক ভাগ জমির মালিক—এই দাবি থেকে তেভাগা আন্দোলনের সূত্রপাত। দিনাজপুর ও রংপুর জেলায় এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল। এই আন্দোলনের অন্যতম কৃষক নেতা ছিলেন কমরেড কম্পরাম সিংহ। তিনি রাজবন্দির সঙ্গে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে গণহত্যায় শহিদ হন।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
