নদী ভাঙন, খরা, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অসহায়, বাল্য বিবাহ, যৌতুকের শিকার, স্বামী পরিত্যক্তা কর্মহীন নারীরা ভিড় জমাচ্ছে সীমান্ত শহর বেনাপোল চেকপোস্টে। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দূরদূরান্ত থেকে আসা এসব নারীদের চোখে পড়ে। এরা পরিবার পরিজনের দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন যোগাতে চেকপোস্ট এলাকায় ভিড় জমায়। এখানে ভারত থেকে আসা পাসপোর্টযাত্রীদের নিকট থেকে তারা কিছু পণ্য ক্রয় করে বেনাপোল বাজার, যশোর, খুলনাসহ অন্যান্য জায়গায় বিক্রি করে সংসার চালায়।খুলনা থেকে বেনাপোলগামী কমিউটার ট্রেনে করে এরা প্রতিদিন সকালে এসে নামে বেনাপোল রেলস্টেশনে। সেখান থেকে ইজিবাইক, ভ্যান রিকশায় করে দলবদ্ধভাবে চলে আসে চেকপোস্ট এলাকায়। এসব মহিলাদের হাতে থাকে বড় বড় ব্যাগ ও বস্তা। এসব মহিলাদের মধ্যে অনেকে স্বামী পরিত্যক্তা, স্বামী নেশাগ্রস্ত ও বিধবার পাশাপাশি উঠতি যুবতীরাও রয়েছে। এদের জীবিকা নির্বাহ ও সংসার চালানোর একমাত্র উৎস ভারতীয় মালামাল চেকপোস্ট এলাকা থেকে কিনে যশোর-খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করা। অনেক নারীরা বলেন, এ ব্যবসা থেকে ফিরে আসাও কঠিন হয়ে পড়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে তল্লাশির পরও সব কিছু মুখ বুঝে সহ্য করে পেটের দায়ে এ ব্যবসা করছি।বেনাপোল চেকপোস্টে আসা নারীদের সাথে কথা প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ থেকে আসা কহিনুর বেগম বলেন, ‘আমি আমার গ্রাম থেকে চলে এসেছি নদী ভাঙনের জন্য। আমাদের ভিটে মাটি কিছু নেই। স্বামী নেই। দুই মেয়েকে নিয়ে কাজের সন্ধানে বেনাপোল এসে একটি ঘর ভাড়া করি। এরপর কাজ না পেয়ে পাশের একজন মহিলার সহযোগিতায় বেনাপোল চেকপোস্ট এসে ভারত থেকে আসা বিভিন্ন পণ্য ক্রয় করি। যেখানে যে রকম সুযোগ হয় তাই বিক্রি করে যা রোজগার হয় তাই নিয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে চলি।’ঝিনাইদহ থেকে আসা রহিমা বলেন, ‘তার স্বামী আরও একটি বিয়ে করার পর তাকে দেখে না। এরপর সে বেনাপোল এসে ঘর ভাড়া করে চেকপোস্ট এলাকায় পাসপোর্টযাত্রীদের নিকট থেকে কম্বল, প্রসাধনী সামগ্রী, খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করে জীবনযাপন নির্বাহ করি।’নড়াইল থেকে আসা সালেহা বেগম জানায়, ‘তার স্বামী তাকে ছেড়ে দিয়েছে। এরপর মা-বাবার সংসার ও খুব অভাব অনটনের মধ্যে চলে। বাধ্য হয়ে তার নাবালক এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বেনাপোল পাড়ি জমাই। এরপর ভাল কোন কাজ না পেয়ে অন্য আরো ১০ জন নারীর মতো সে এখানে জীবিকা নির্বাহের জন্য ভারত থেকে আসা বিভিন্ন পণ্য ক্রয় করে যা উপার্জন করে তা দিয়ে সংসার চালাই।’খুলনা, দৌলতপুর, নোয়াপাড়া থেকে আসা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন তরুণী বলেন, ‘খুলনা থেকে আয়ের উৎস হিসাবে বেনাপোলে প্রতিদিন সকালে ট্রেন যোগে আসি এবং এখান থেকে কম্বলসহ কিছু খাদ্য দ্রব্য ক্রয় করে দুপুরে বা বিকেলে ট্রেনে করে খুলনায় নিয়ে বিক্রি করে সংসার চালাই। সব থেকে বড় সমস্যা হলো এসব পণ্য ক্রয় করে ট্রেনে বাসে খুলনা যেতে গেলে পদে পদে তল্লাশি করে। মাঝে মাঝে বিজিবির চেকে অনেক মালামাল নিয়েও যায়। আবার অনেক সময় অনুরোধ করার পরও কিছু বিজিবি দয়া মায়ার খাতিরে ছেড়েও দেয়। এভাবে জীবনের সাথে যুদ্ধ করছি।’প্রতিদিন বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্টে নারীরা দাঁড়িয়ে থাকলে দেশের সম্মানও নষ্ট হয়। কারণ এটা রাষ্ট্রের প্রধান ফটক। এ পথে প্রতিদিন দেশী বিদেশী পর্যটক ভারত-বাংলাদেশ আসা যাওয়া করে। আর সেই প্রবেশ মুখে দারিদ্রতার ছাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অসহায় কয়েকশ’ নারী। ভারতীয় কিছু লোক বৈধ পাসপোর্টের মাধ্যমে কিছু ভারতীয় পণ্য এদেশে এনে এসব মহিলাদের কাছে ও চেকপোস্টের কিছু দোকানে বিক্রি করে চলে যায়। এসব মালামাল মহিলারা কিনে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায়। চেকপোস্ট থেকে রেলস্টেশন পর্যন্ত আসার সময় বিভিন্ন স্থানে এমনকি রেলের বগির মধ্যেও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার তল্লাশিতে টানা হেচড়া চলে। অনেকে কান্নাকাটি করে হাত পা জড়িয়ে ধরে আনীত মালামাল বাঁচানোর চেষ্টা করে থাকতে দেখা যায়।এলাকার সচেতন মহল বলেন, এসব অসহায় নারীদের জন্য কর্মসংস্থান সরকারি ভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। নইলে এদের মানবতার জীবন যাপন করতে হচ্ছে। এদের ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎও রয়েছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। এদের কর্মসংস্থানের প্রয়োজন। যে সকল নারীরা বেনাপোল চেকপোস্টে পাসপোর্ট যাত্রীদের নিকট থেকে পণ্য ক্রয় করার উদ্দেশ্যে আসে তাদের সকলের বয়স ২০ থেকে ৪০ এর মধ্যে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, ‘বিষয়টি মানবিক হলেও আমাদের উর্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে দায়বদ্ধতা আছে। বাধ্য হয়ে কড়াকড়ি করতে হয়। এসব নারীরা কোনো নিষেধ মানে না। এটা একটি আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট। দেশের ভাবমূতিও যাতে ক্ষুণ্ণ না হয় সে দিকেও লক্ষ্য রাখতে হয়। তবে চেকপোস্ট এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধে আমরা সবসময় সতর্ক অবস্থায় রয়েছি।’ এইচএ
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
