‘শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালায় না, পালাতে জানে না’- এই বাক্যটি তিনি নিজেই বহুবার উচ্চারণ করেছেন। অথচ ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতায় গত বছরের এই দিনেই, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, সেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার প্রবল গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।শেখ হাসিনার আকস্মিক পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নাটকীয় পালাবদলের সূচনা হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে ছাত্র-জনতার দুর্বার গণআন্দোলনের মাধ্যমে।বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণার পর ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করেন। তবে তা আন্দোলন দমন করতে ব্যর্থ হয়। পরদিন, ছাত্র-জনতার ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে ৫ আগস্ট বেলা আড়াইটার দিকে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। এরপর সামরিক হেলিকপ্টারে ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে গণভবন ত্যাগ করে দ্রুত দেশের আকাশসীমা ছাড়েন। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে যিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তার এমন নীরব, গোপন ও নাটকীয় প্রস্থান দেশের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। তার এই আকস্মিক ও নীরব দেশত্যাগে চরম হতবাক হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলো। দলীয় সূত্র মতে, তিনি নিজের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের অনেককেও এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কিছুই জানাননি।আন্দোলনের সময় এবং এর ঠিক আগেও শেখ হাসিনা বারবার দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যাবেন না। চীন সফর শেষে ১৪ আগস্ট ২০২৪ এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ‘অনেকেই বলেছে প্রধানমন্ত্রী পালিয়েছে, শেখ হাসিনা পালায় না।’ এরপর গত ১ আগস্টও রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা একই কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।এর আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘তীব্র গণজোয়ার শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ পালানোর পথ পাবে না।’ তার এই বক্তব্যের জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ কখনো পালায় না, কোনো দিন পালায়নি।’ রাজনৈতিক অঙ্গনে এই বক্তব্য শক্ত অবস্থানের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হলেও মাত্র ক’দিনের ব্যবধানে বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার পদত্যাগ ও পরবর্তী দেশত্যাগ শুধু জনমনে নয়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝেও গভীর বিস্ময় সৃষ্টি করে।নির্বাচন বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নৌ পরিবহণ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন একটি গণমাধ্যমে লিখেছেন, ‘দেশে আজকে যা ঘটল, এটাই হওয়ার কথা ছিল। গণ-অভ্যুত্থান কখনো ঠেকানো যায় না। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন সহজেই সমাধান করা যেত। কিন্তু, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জেদের কারণে এত মানুষ মারা গেল।’তিনি আরও বলেন, ‘গণমাধ্যমে প্রাণহানির যে চিত্র উঠে এসেছে, বাস্তবে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি। আরও কত মরদেহ কোথায় পড়ে আছে, কত গণকবর হয়েছে, কতগুলো নিরীহ মানুষের প্রাণ ঝরেছে! তিনি তো চলে গেলেন। এখন এর জবাব দেবে কে?’আজ সেই ঐতিহাসিক ঘটনার এক বছর পূর্তি। দিনটি সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে। সারাদেশে পালিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ছুটি। এই দিবসটি পরবর্তীকালে ‘৩৬ জুলাই’ নামে পরিচিতি পায়। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এক বাণীতে বলেন, বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ফ্যাসিবাদী অপশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলে ২০২৪ সালের আজকের এই দিনে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ঐতিহাসিক এই অর্জনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আমি দেশের মুক্তিকামী ছাত্র-জনতাকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।’ রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র একটি ব্যাপক সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এই সংস্কারের মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হবে, প্রকৃত গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে একটি ন্যায় ও সাম্যভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ-আজকের এই দিনে এ আমার একান্ত প্রত্যাশা।’ একই দিনে দেওয়া আরেকটি বাণীতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘এক বছর আগে এই দিনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পূর্ণতা পায়, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্ত হয় প্রিয় স্বদেশ। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ, যাদের যূথবদ্ধ আন্দোলনের ফসল আমাদের এই ঐতিহাসিক অর্জন, তাদের সবাইকে আমি এই দিনে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।আজ আমি স্মরণ করছি সেই সব সাহসী তরুণ, শ্রমিক, দিনমজুর ও পেশাজীবীদের, যারা ফ্যাসিবাদী শক্তিকে মোকাবিলা করতে গিয়ে শাহাদত বরণ করেছেন। আমি গণ-অভ্যুত্থানে শাহাদত বরণকারী সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আমি গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি সকল জুলাই যোদ্ধাকে যারা আহত হয়েছেন, চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন, হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। জাতি তাদের অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।’সরকারি গেজেট অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন ৮৩৪ জন। তবে জাতিসংঘের প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে দেশে ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের মতে, ওই হত্যাকাণ্ডগুলোর অনেকগুলোই ঘটেছে শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও তদারকিতে।আজকের দিনটি শুধুই একটি দিবস নয়, এটি গণতন্ত্রের জন্য রক্তঝরা সংগ্রামের চিহ্ন বহনকারী স্মারক। শেখ হাসিনাবিহীন এক নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয় সেই ৫ আগস্টেই, যেদিন দেশের মাটিতে একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটেছিল ছাত্র-জনতার বজ্রকণ্ঠে।এসকে/আরআই

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
সমাজসেবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
সমাজসেবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠেছে। তার বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকারি ভবন Read more

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ৭ ওমরাহযাত্রীর
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ৭ ওমরাহযাত্রীর

সৌদি আরবের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ ওমরাহযাত্রী নিহত হয়েছেন। তারা সবাই পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন। নিউজ শনিবার (২৬ জুলাই) পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম এআরওয়াই Read more

দেওয়ানগঞ্জে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে একজনের কারাদণ্ড
দেওয়ানগঞ্জে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে একজনের কারাদণ্ড

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার হাতিভাঙ্গা ইউনিয়নের সবুজপুরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে মো. হযরত আলী (৩৫) নামে একজনকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড Read more

অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের সময় ৪ নারী-পুরুষকে আটক
অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের সময় ৪ নারী-পুরুষকে আটক

পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের সময় যশোরের শার্শা উপজেলার গোগা সীমান্ত থেকে চার নারী-পুরুষকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড Read more

ঈদ উপলক্ষ্যে দীর্ঘ ছুটি পাচ্ছেন বাঙলা কলেজ শিক্ষার্থীরা
ঈদ উপলক্ষ্যে দীর্ঘ ছুটি পাচ্ছেন বাঙলা কলেজ শিক্ষার্থীরা

সরকারি বাঙলা কলেজের চিরচেনা প্রাঙ্গণ এখন অনেকটাই নির্জন। শ্রেণিকক্ষ বন্ধ, ছাতিমতলায় নেই ভিড়, লাইব্রেরি ঘরেও নেই পাঠকের আনাগোনা। ইলশে গুড়ি Read more

যশোরে অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা গ্রাহকদের টাকা নিয়ে লাপাত্তা!
যশোরে অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা গ্রাহকদের টাকা নিয়ে লাপাত্তা!

অগ্রণী ব্যাংক যশোর শাখার এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এফডিআর ও সঞ্চয় হিসাবের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন