দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসলের মধ্যে আলু অন্যতম। দামে সস্তা ও বিভিন্ন খাদ্যে সহায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহারের কারণে এর চাহিদাও ব্যাপক। তবে আলুর আকার, বাহ্যিক ত্রুটি ও ক্রেতাদের চাহিদার উপর ভিত্তি করে বাজার মূল্যেও ভিন্নতা রয়েছে। দেশে এখনও মানভেদে আলুর এই বাছাই প্রক্রিয়াটি হাতে করা হয়। যা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য, সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।কৃষকের এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও ব্যয় কমাতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক অটোমেটেড পটেটো গ্রেডার মেশিন উদ্ভাবন করেছেন। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলুর আকার ও ত্রুটি শনাক্ত করতে পারে। প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ কেজি আলু বাছাই করতে সক্ষম। এছাড়া প্রতি কেজি আলু বাছাইয়ে খরচ হয় মাত্র ১২ পয়সা, যা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় ৭০ গুণ সাশ্রয়ী। এর বাজারমূল্য প্রায় ৭ লাখ টাকা হলেও বিদেশ থেকে আমদানি করা একই ধরনের মেশিনের দাম প্রায় ৪০ লাখ টাকা। ২০২২ সালে এই যন্ত্রের গবেষণা শুরুর পর থেকেই অধিকতর উন্নয়নে গবেষণা চলমান রয়েছে।যন্ত্রটিতে সর্বাধুনিক ভিশন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, যা আলুর আকার ও আকৃতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করে আলু আলাদা করতে পারে। এতে রয়েছে হপার সিস্টেম, কনভেয়ার বেল্ট, ইমেজিং অ্যাকুইজিশন সিস্টেম, ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিসিডি ক্যামেরা, নিউমেটিক ইজেকশন সিস্টেম, ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল ইউনিট এবং কম্পিউটারভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবস্থা।হপার থেকে আলু কনভেয়ার বেল্টে আসার পর উচ্চক্ষমতার সিসিডি ক্যামেরা সেকেন্ডে ৫৩৯ টি ছবি বিশ্লেষণ করে দ্রুত আলুর মাপ ও আকৃতি শনাক্ত করে। এরপর সফটওয়্যার আলুগুলোকে বড়, মাঝারি ও ছোট এই তিন গ্রেডে ভাগ করে। পরে নিউমেটিক ইজেকশন সিস্টেম নির্ধারিত গ্রুপ অনুযায়ী আলুগুলো আলাদা করে দেয়।যন্ত্রটি উদ্ভাবন করেছেন কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান ও অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী। এছাড়া গবেষণায় আরও যুক্ত ছিলেন সহকারী অধ্যাপক সাহাবুদ্দীন আহমেদ, স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মিরাজুস সালেহীন সায়েম, মো আলামিন ও কাজী সাকিবুর রহমান।অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান বলেন, মানুষের একটি সহজাত প্রবণতা হলো সমান আকৃতির ও বাহ্যিকভাবে ত্রুটিমুক্ত আলু ক্রয় করা। ভোক্তাদের এই মনস্তাত্তি¡ক বিষয় বিবেচনায় রেখেই যন্ত্রটি উদ্ভাবনে আগ্রহী হয় । এটি পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ দুইজন শ্রমিকই যথেষ্ট। ভবিষ্যতে ব্যাপক হারে উৎপাদন শুরু হলে এটি নামমাত্র মূল্যেই পাওয়া সম্ভব হবে।অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী বলেন, এই যন্ত্রটি আলু শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আলুর আকার ও গুণগত মান যাচাই করার মাধ্যমে চিপস, ক্র্যাকার ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাই উৎপাদনে সমান আকার নিশ্চিত করবে এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সহজ করবে। এছাড়া এটি রপ্তানির ক্ষেত্রে মানসম্মত ও অভিন্ন পণ্য সরবরাহেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে সক্ষম। বীজ আলুর জন্য সঠিক আকার নির্বাচন করে ফলন বাড়াতেও অবদান রাখবে। কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণের আগে গ্রেডিং করলে পচন কমে এবং সংরক্ষণ দক্ষতা বাড়ে। ব্যবসায়ী ও ট্রেডারদের জন্য এই যন্ত্রটি দ্রুত বাছাই, সময় সাশ্রয় এবং বাজারমূল্য বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে, ফলে সামগ্রিকভাবে লাভজনকতা বৃদ্ধি পাবে বলে দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করেন।বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, “যন্ত্রটি অসাধারণ। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলুর শারীরিক গঠন বিশ্লেষণ করে দ্রুত বাছাই করতে পারে। সফটওয়্যার ও কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট অংশ বাদে অন্যান্য অংশে প্লাস্টিক ব্যবহার করা গেলে যন্ত্রটির খরচ আরও কমবে এবং এটি ছোট আকারে তৈরি করে সুলভমূল্যে কৃষকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।”এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
