পর্যটননির্ভর নগরী কক্সবাজারে রেল যোগাযোগ চালুর মাধ্যমে যে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি ও গতিশীলতা প্রত্যাশিত ছিল, বাস্তব চিত্র সেখানে এক ভিন্নতর সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে। দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম এবং টিকিটের সংগঠিত কালোবাজারিকে ঘিরে কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন এখন এক বিতর্কিত প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান। বিশেষত টিকিট বিপণন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।যাত্রীদের ধারাবাহিক অভিযোগ অনুযায়ী, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকিট উন্মুক্ত হওয়ার পরপরই তা ‘সোল্ড আউট’ হয়ে যায়; অথচ কিছুক্ষণের ব্যবধানে একই টিকিট বহুগুণ উচ্চমূল্যে অনানুষ্ঠানিক বাজারে প্রাপ্তিযোগ্য হয়ে ওঠে। কাউন্টারভিত্তিক বিক্রয় ব্যবস্থাও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে টিকিট ব্যবস্থাপনার ওপর একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান, এমন ধারণা ক্রমশ সুসংহত হচ্ছে।২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর কক্সবাজার রেলপথ উদ্বোধনের পর থেকেই অস্বাভাবিক চাহিদা লক্ষ্য করা যায়। ঢাকা–কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে টিকিটের অতি দ্রুত নিঃশেষ হওয়া প্রক্রিয়া শুরু থেকেই সন্দেহের উদ্রেক করে। পর্যটন মৌসুমে এই সংকট বহুগুণ তীব্রতা লাভ করে এবং টিকিট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগ জোরালো হয়।স্থানীয় সূত্র, যাত্রীদের অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্য এবং রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ একাধিক কর্মচারীর ভাষ্য পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, এটি বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং একটি সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে টিকিট সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বুকিং কাউন্টারের কিছু কর্মচারী এবং প্রভাবশালী মহলের সমন্বয়ে টিকিট ব্লকিং, তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং পরবর্তীতে তা কালোবাজারে সরবরাহের একটি কৌশলগত প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছে।এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীর নাম। স্টেশন উদ্বোধনের পর থেকে দীর্ঘ সময় একই পদে বহাল থাকা এবং একাধিকবার বদলির উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার ঘটনাও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রভাববলয়ের কারণে তার বদলি প্রক্রিয়া বারবার স্থগিত হয়েছে।প্রাপ্ত নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর টিকিট বুকিং সহকারী ইব্রাত হোসেনকে কক্সবাজার থেকে ফেনীর হাসানপুর স্টেশনে বদলি করা হয়। এই পরিবর্তনের ফলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আসবে, এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবতায় তার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, পূর্বতন কাঠামো নতুন বিন্যাসে পুনরায় সক্রিয় রয়েছে।স্টেশনভিত্তিক টিকিট ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে গোলাম রব্বানীর নাম একাধিকবার উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, টিকিট সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব বিদ্যমান। ফলে একটি কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হচ্ছে বলে ধারণা দৃঢ় হয়েছে।২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জারি করা এক প্রশাসনিক আদেশে তাকে ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্দিষ্ট দপ্তরে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে তিনি উপস্থিত হননি; জানা যায়, তিনি ওই সময় ছুটিতে ছিলেন। এই অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক জবাবদিহি ও সমন্বয় সংকট নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে।এর পূর্বে ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর জারি হওয়া আরেকটি আদেশে একই ইউনিটে একাধিক কর্মকর্তার পদায়ন ও সংযুক্তির বিষয়টি প্রশাসনিক কাঠামোর জটিলতা বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে অভিমত রয়েছে। দায়িত্ব বণ্টনে অস্পষ্টতা এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না পেলেও তা অপ্রকাশ্যভাবে বিরাজমান।টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে প্রথম উল্লেখযোগ্য আইনি পদক্ষেপ আসে ২০২৩ সালের শেষভাগে, যখন কক্সবাজার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে টিকিট বিক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং বিষয়টিকে ফৌজদারি অপরাধের পরিসরে বিবেচনা করা হয়। তবে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে পরবর্তীতে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের টিকিট ব্যবস্থাপনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে। দুদকের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হুমায়ুন বিন আহমদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে স্টেশন কর্তৃপক্ষের কাছে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলমান সময় পর্যন্ত টিকিট বিক্রির পূর্ণাঙ্গ তথ্য, অনলাইন ও অফলাইন রেকর্ড, কাউন্টারভিত্তিক হিসাব, কোটা বরাদ্দ তালিকা, সিস্টেম লগ এবং ডিউটি রোস্টারসহ বিস্তৃত নথিপত্র চাওয়া হয়।প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুদক উল্লেখ করেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে টিকিট ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মূল্যে টিকিট বিক্রির অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে। অনলাইন সার্ভার লগ ও বিক্রয় তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র উদঘাটনের পরিকল্পনা রয়েছে।২০২৬ সালের ২০ মার্চ রেলপথ প্রতিমন্ত্রী চট্টগ্রাম রেলস্টেশন পরিদর্শন শেষে টিকিট কালোবাজারি রোধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিলেও কক্সবাজার রুটে এর কার্যকর প্রতিফলন এখনো অনুপস্থিত। যাত্রীদের অভিমত, পরিস্থিতি কার্যত অপরিবর্তিত রয়েছে।ভুক্তভোগী যাত্রীদের বক্তব্য অনুযায়ী, অনলাইনে একাধিক প্রচেষ্টার পরও টিকিট পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছে; কাউন্টারেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ব্যর্থ হতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ বাধ্য হয়ে অনেকেই দ্বিগুণ বা ত্রিগুণ মূল্যে কালোবাজার থেকে টিকিট সংগ্রহ করছেন, যা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।স্টেশন মাস্টার গোলাম রব্বানীর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, টিকিট সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগত পরিচিতদের জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার অভিযোগও রয়েছে।অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্যে তিনি সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান। কোনো অনিয়ম থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমেই প্রতীয়মান হবে। রানিং স্টাফ রুম ব্যবহারের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, রুমটি খালি থাকায় ব্যবহার করা হচ্ছে; তবে এর প্রশাসনিক বৈধতা প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।পূর্বাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন সময়ের কন্ঠস্বর-কে জানিয়েছেন, বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে এবং বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম শিগগিরই সরেজমিনে অনুসন্ধান শুরু করবে বলে জানা গেছে। তদন্ত শেষে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে এবং সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি কার্যক্রম নির্ধারিত হবে।এফএস
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
