সাভারের উত্তর কাউন্দিয়া মৌজা। নথিপত্রে যা একসময় ছিল ‘ভারত সম্রাট’-এর জায়গা, পরবর্তীতে যা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নামে রেকর্ডভুক্ত। কিন্তু পর্দার আড়ালে একদল ‘অসাধু কর্মকর্তা’ আর ‘ভূমি দস্যুদের’ যোগসাজশে বদলে গেছে সেই ইতিহাস। নদী হয়ে গেছে ডোবা, আর সরকারি ১ একর (একশত শতাংশ) জমি রাতারাতি চলে গেছে ব্যক্তির নামে! এই ‘মহাজালিয়াতির’ অনুসন্ধান করতে গিয়ে খোদ সাংবাদিককেই পোহাতে হয়েছে ‘হেনস্তা’ আর ‘হুমকি’।সময়ের কণ্ঠস্বরের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো সাভার সেটেলমেন্ট ও আমিনবাজার ভূমি অফিসের দুর্নীতির এক লোমহর্ষক অধ্যায়।জালিয়াতির শুরু: নদী যখন ডোবা (২০১৮ সাল)অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৮ সালে বিডিএস জরিপের সময় সাভার সেটেলমেন্ট অফিসের সার্ভেয়ার হাফিজুর রহমান প্রথম গুটির চাল চালেন। উত্তর কাউনদিয়া মৌজায় মাঠ জরিপে সি.এস ও আর.এস রেকর্ডে যা ছিল নদী, ভূমিদস্য সিন্ডিকেটের টাকার বিনিময় তা কৌশলে শ্রেণির পরিবর্তন করে বানানো হয় ‘ডোবা’। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট- জমিটি ব্যক্তিমালিকানায় নেওয়ার পথ তৈরি করা।২০১৮ সালের উত্তর কাউন্দিয়া মৌজায় মাঠ জরিপের তৎকালীন দায়িত্ব থাকা সেটেলমেন্ট অফিসের সার্ভেয়ার হাফিজুর রহমান ও ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট কাছ থেকে ঘুষের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের জেলা প্রশাসকের ১ একর জায়গা ব্যক্তি নামে মাঠ জরিপ করে নেন। জাল সার্টিফিকেট ও উপ-সহকারী মাহবুল আলমের ভূমিকা২০২১ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে ৩০ ধারায় আপত্তি মামলা করেন সালেহা বেগম, ফাতেমা বেগম ও শাহাবুদ্দিন। ২০২৩ সালে সাভার সেটেলমেন্ট অফিসের উপ-সহকারী এ কে এম মাহবুবুল আলম কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিডিএস জরিপে সরকারের ১ একর জমি মোছা: সালেহা বেগম ও ফাতেমা বেগমদের নামে লিখে দেন।অভিযোগ রয়েছে, আমিনবাজার ভূমি অফিসের তৎকালীন কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম ‘ভুয়া’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, আর.এস ৯৮৮ খতিয়ানের ৬২৭৪/৬৩২৬ দাগের জমিতে বাদীগণ সরকারি খাজনা পরিশোধ করা রয়েছে। এই জমিতে সরকারের কোনো স্বার্থ নেই ! ভূমি অফিসের ‘পাতা ছেঁড়া’ রহস্য ও নায়েব নজরুলঅনুসন্ধানকালে আমিন বাজার ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, জালিয়াতি পাকাপোক্ত করতে আমিনবাজার ভূমি অফিসের তৎকালীন নায়েব নজরুল ইসলাম সরকারি স্বার্থ সংরক্ষণের বদলে কাজ করেছেন দস্যুদের পক্ষে। আর.এস ৯৮৮ নং খতিয়ানের ৬২৭৪/৬৩২৬ দাগের সরকারি রেকর্ড বইয়ের দুটি পাতা ছিঁড়ে গায়েব করে দেওয়া হয় তার মাধ্যমে।আমিন বাজারের ভূমি অফিসে আর.এস ৯৮৮ নং খতিয়ানের ৬২৭৪/৬৩২৬ দাগের সরকারি রেকর্ড বইয়ের দুটি পাতা ছেঁড়া রয়েছে বলে স্বীকার করেন আমিনবাজার ভূমি অফিসের বর্তমান নায়েব মো.মনিরুজ্জামান। সময়ের কণ্ঠস্বরের প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ভূমি অফিসে আর.এস ৯৮৮ নং খতিয়ানের ৬২৭৪/৬৩২৬ দাগের সরকারি রেকর্ড বইয়ের দুটি পাতা ছেঁড়া দেখতে পাচ্ছি। তবে ছেঁড়ার বিষয়টি আমি অবগত নই। সরকারি রেকর্ড বইয়ের এই দুটি পাতা ছেঁড়ার বিষয়ে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। জাল সার্টিফিকেট ও নতুন কৌশল (২০২৪–২০২৫)২০২৪ সালে আবেদনকারীরা জমির পরিমাণ কম দেখানো হয়েছে দাবি করে সংশোধনের নামে আবেদন করা হয়। ২০২৫ সালে ঢাকা রেকর্ডরুমের একটি জাল সার্টিফিকেট দেখিয়ে জমির পরিমাণে পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই সার্টিফিকেটটি সম্পূর্ণ ভুয়া। এরপর ৩১৫/২০২৪ নম্বর মিস কেস দায়ের করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান সার্ভেয়ার হান্নান মিয়া।তদন্ত প্রতিবেদনে সার্ভেয়ার হান্নানের ‘মনগড়া’ তথ্য২০২৪ সালের (১২ ডিসেম্বর) ৩১৫/২৪ এর মিস কেস সরেজমিন প্রতিবেদনে আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেল ভূমির সাবেক সার্ভেয়ার ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কানুনগো হান্নান মিয়া দাবি করেন, আবেদনকারীরা নালিশী দাগের জমিতে ভোগদখলে আছেন। তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জমি আবেদনকারীদের দখলে আছে জানতে পেরেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করেন।তবে সময়ের কণ্ঠস্বরের অনুসন্ধানকালে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এলাকাবাসীরা বলেন, ‘এটি তুরাগ নদীর অংশ, বর্ষায় পানি থাকে, আমরা মাছ ধরতাম। বর্তমানে এই জায়গাটিতে বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে, যা কিছুদিন আগেও নদী বা জলাশয় ছিল। আমরা জানতাম এটি সরকারি জমি এবং এখানে আমরা বিগত দিনগুলোতে দেখেছি নদী প্রবাহিত হতো।’সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) বাসিত সাত্তার ও মিস কেস ৩১৫/২০২৪২০২৫ সালের ২০ মার্চ, আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেলের তৎকালীন এসিল্যান্ড মো: বাসিত সাত্তার ও বিপুল অর্থের বিনিময়ে জালিয়াতির চূড়ান্ত সিলমোহর দেন। ৩১৫/২০২৪ নং মিস কেসের মাধ্যমে তারা ১ একর সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিনামে হস্তান্তর করেন।তবে আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেলের সাবেক মিস কেস সহকারি জায়েদ আল রাব্বি সরকারি জমি আত্মসাৎ করতে মিস কেসের রায় পক্ষে পেতে অবৈধ অর্থের বিনিময় সালেহা বেগম ও ফাতেমা বেগমের সরকারি জমি আত্মসাৎ করতে সাহায্য করেন।অভিযোগ রয়েছে, এই জায়েদ আল রাব্বি ও বর্তমান কানুনগো হান্নান মিয়া এই পুরো জালিয়াতির ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে কাজ করেছেন।প্রতিবেদকে হেনস্তা ও বর্তমান এসিল্যান্ডের ভূমিকাজেলা প্রশাসকের জায়গাআত্মসাৎ ও জালিয়াতি নিয়ে যখন প্রতিবেদন তৈরি করতে বর্তমান এসিল্যান্ড শাহাদাত হোসেন খানের কাছে যাওয়া হয়, তখন বেরিয়ে আসে এক ভিন্ন চিত্র। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিচার না করে বরং তাদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। সাংবাদিককে তথ্য না দিয়ে তিনি উল্টো হেনস্তা করার চেষ্টা করেন।সময়ের কন্ঠস্বরের প্রতিবেদককে বর্তমান এসিল্যান্ড শাহাদাত হোসেন খান বলেন, ‘আপনি আমার কর্মকর্তাদের ডিস্টার্ব করবেন না। আপনার জন্য তারা কাজ করতে পারছে না। আপনার অফিসের অনুমতি নিয়ে আমার অফিসে আসবেন।’ এমনকি জালিয়াতির প্রমাণ হিসেবে ‘রেকর্ড বইয়ের পাতা ছেঁড়া’র বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি সুকৌশলে তা এড়িয়ে যান এবং কর্মকর্তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন। অভিযোগের বিষয়ে বিতর্কিত আমিন বাজার রাজস্ব সার্কেলের তৎকালীন এসিল্যান্ড ও বর্তমান লৌহজং উপজেলার এসিল্যান্ড মো: বাসিত সাত্তারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আমি তো অনেকদিন হয়েছে চলে এসছি ভাই। কোন মিস কেসের কথা বলছেন তা তো মনে রাখা খুবই কষ্টকর। আপনি মিস কেস নাম্বারটা দেন তারপর বলতে পারব।’এ বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) রেজাউল করিমের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায় নি।ইখা
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
