জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের প্রভাবে রাজশাহীর বাঘা উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এক সময়ের জনপ্রিয় বাহন সাইকেল, যা আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও মানুষের প্রধান ভরসায় পরিণত হচ্ছে।ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, উনিশ শতকের গোড়ার দিকে সাইকেলের যাত্রা শুরু হয় । ১৮৮৮ সালে আধুনিক সাইকেলের প্রচলন ঘটে। ফ্রান্সের পিয়ের মিশো এবং যুক্তরাষ্ট্রের পিয়ের লালেমেন্ট প্যাডেলচালিত সাইকেল আবিষ্কার করেন। বাংলাদেশেও একসময় সাইকেল ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় বাহন, এমনকি বিয়েতে যৌতুক হিসেবেও এর ব্যবহার ছিল। পরবর্তীতে মোটরসাইকেলের সহজলভ্যতা ও দ্রুতগতির কারণে সাইকেলের ব্যবহার কমে যায়।আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় তেলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক জায়গায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষ বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন।বাঘা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্যকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এখন নিয়মিত সাইকেল ব্যবহার করছেন।দীঘা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অর্থনীতি বিষয়ের প্রভাষক নাসিমুজ্জামানকে দেখা যায় সাইকেল করে কলেজে আসতে। তিনি জানান, একসময় সাইকেলে চলাচল করলেও পরে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। কিন্তু বর্তমানে তেল সংকটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১৬ কিলোমিটার পথ সাইকেলে পাড়ি দিয়ে কলেজে যাতায়াত করছি। বয়সের কারণে কষ্ট হলেও উপায় নেই।ফতেপুর বাউসা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরুজ্জামান বলেন, গ্রামের দোকানগুলোতে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। পাম্পে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও দিনে ১-২ লিটার তেল মেলে। তাই বাধ্য হয়ে সাইকেলেই চলাচল করছি।পল্লী চিকিৎসক মতিউর রহমান কালু বলেন, মানুষকে সেবা দেওয়াই আমার দায়িত্ব। তেল থাক বা না থাক, সাইকেলেই রোগীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছি।এদিকে কলেজ শিক্ষার্থী আব্দুল বারী জানান, আগে তার বাবা মোটরসাইকেলে করে তাকে কলেজে আনা-নেওয়া করতেন। কিন্তু বর্তমানে তেলের অভাবে তাকে অটোরিকশায় যাতায়াত করতে হচ্ছে।বিভিন্ন কোম্পানির মার্কেটিং প্রতিনিধিরা জানান, প্রতিদিন প্রায় ১০০ কিলোমিটার মোটরসাইকেল চালিয়ে কাজ করতে হয় তাদের। কিন্তু পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মোবারক হোসেন ও শাহিন আলম বলেন, “ছুটির দিন কিংবা রাতে পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে যে তেল সংগ্রহ করি, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। আমরা চরম বেকায়দায় আছি।”অন্যদিকে পদ্মা নদীর চরাঞ্চলের বাসিন্দারা, যারা মোটরসাইকেল ভাড়া দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারাও পড়েছেন বিপাকে। তেলের অভাবে তাদের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।উপজেলার দুর্গম চর এলাকায় মোটরসাইকেল চলাচল কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও ভোগান্তি বেড়েছে।বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাম্মী আক্তার বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট আমাদের চলাচলের অভ্যাসে বড় পরিবর্তন এনেছে। তবে এটি ইতিবাচকভাবেও দেখা যায়। সাইকেল একটি পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যসম্মত বাহন। অনেকেই এখন বিকল্প হিসেবে সাইকেল বেছে নিচ্ছেন, যা ভবিষ্যতের জন্যও ভালো দৃষ্টান্ত।তিনি আরও জানান, সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ করছে। পাশাপাশি জনগণকে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।জ্বালানি সংকট মানুষের জীবনে সাময়িক সংকট তৈরি করলেও, এর মধ্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়ার একটি নতুন প্রবণতা তৈরি হচ্ছে যা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
