কুমিল্লা নগরীর টেকসই উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক নানা প্রস্তাবনা তুলে ধরে সিটি করপোরেশন প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন নাগরিক অধিকার ফোরাম। সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপুর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। এর আগে প্রশাসকের সভাপতিত্বে সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।সভায় নগরীর দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা, নাগরিক ভোগান্তি এবং সম্ভাব্য সমাধানের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। সভাপতির বক্তব্যে প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, অতীতে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশামতো এগোয়নি, কারণ নগরবাসীর পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, একটি শহরকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য রাখতে শুধু সিটি করপোরেশন নয়, নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। ক্লিনিক, বাসাবাড়ি ও মার্কেটের মালিকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার রাখার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।তিনি আরও জানান, স্মারকলিপিতে দেওয়া বেশিরভাগ প্রস্তাবই সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যানজট নিরসনে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে ধাপে ধাপে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলেন তিনি। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে দোকান ও মার্কেট মালিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন। পাশাপাশি অটোরিকশাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সেগুলোকে লাইসেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান। সকলের সম্মিলিত সহযোগিতায় কুমিল্লাকে একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তরের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।সভায় শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন নাগরিক অধিকার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক শাহাজাদা এমরান। পরে সংগঠনের সভাপতি ডা. প্রফেসর মো. আবদুল লতিফ স্মারকলিপির মূল বিষয়গুলো তুলে ধরে নগরবাসীর দৈনন্দিন দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরেন।স্মারকলিপিতে নগরীর অপরিচ্ছন্ন পরিবেশকে অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে যত্রতত্র ময়লা ফেলার কারণে পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে বলে সংগঠনটির দাবি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে “পরিচ্ছন্ন কুমিল্লা” নামে একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আধুনিক ডাস্টবিন স্থাপন এবং গণশৌচাগার নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় ও প্রধান বাসস্ট্যান্ডগুলোতে আধুনিক গণশৌচাগার স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।পথচারীদের দুর্ভোগের বিষয়টিও স্মারকলিপিতে গুরুত্ব পায়। এতে বলা হয়, নগরীর প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন ফুটপাথ ব্যবহার করেন, কিন্তু অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত ফুটপাথ নেই বা দখল হয়ে আছে দোকানপাট ও স্থাপনায়। কোথাও বৈদ্যুতিক খুঁটি ও সাইনবোর্ড চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, অন্তত ৬ থেকে ৮ ফুট প্রশস্ত ফুটপাথ নিশ্চিত করা এবং বয়োবৃদ্ধ ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের উপযোগী নকশায় ফুটপাথ নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়।যানজট সমস্যার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে সংগঠনটি জানায়, পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় রিকশা, অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে এবং এতে যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক বহুতল ভবনের নির্ধারিত পার্কিং স্থান অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত পার্কিং ছাড়াই নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিকল্পিত গণপরিবহন চালু, যানবাহন নিবন্ধনের আওতায় আনা, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড গড়ে তোলা এবং পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর দাবিও জানানো হয়।স্মারকলিপিতে জলাবদ্ধতার সমস্যাও তুলে ধরা হয়েছে। অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও জলাশয় দখল এবং ড্রেনে বর্জ্য ফেলার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। এ সমস্যা সমাধানে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, খাল ও জলাশয় দখলমুক্ত করা এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস এবং জনগণকে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।নাগরিক সেবার আধুনিকায়নের বিষয়েও প্রস্তাব দেওয়া হয়। সিটি করপোরেশনের সেবা ডিজিটাল পদ্ধতিতে চালু করা, অনলাইনভিত্তিক সেবা ও কার্যকর হেল্পলাইন চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি দূর করতে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কিন্ডারগার্টেন থেকে কলেজ পর্যন্ত একটি আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাব এবং নগরবাসীর জন্য পর্যাপ্ত পার্ক ও খেলার মাঠ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়।স্মারকলিপি উপস্থাপনের পর নাগরিক অধিকার ফোরামের সভাপতি ডা. আবদুল লতিফ বলেন, উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে সিটি করপোরেশন বলে তারা আশা করছেন। নগর উন্নয়নের যেকোনো উদ্যোগে প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে সংগঠনটি প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি জানান।মতবিনিময় সভায় সংগঠনের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ সফিকুর রহমান, জামিল আহমেদ খন্দকার, সিনিয়র সহ সভাপতি অধ্যক্ষ মো. শরিফুল ইসলাম, সহ সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নান, যুগ্ম সম্পাদক রাহুল তারণ পিন্টু, সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন লিটন, অর্থ সম্পাদক অধ্যক্ষ নার্গিস আক্তার, প্রচার সম্পাদক সৈয়দ আহমেদ লাভলু, নির্বাহী সদস্য কাজী ফখরুল আলম, মীর সোহেল এবং সদস্য মোসা. শাহানা আক্তারসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
