স্বাধীনতার ৫৫তম দিবসে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আমরা কি সত্যিই আমাদের অর্জন ও ব্যর্থতার সৎ মূল্যায়ন করছি, নাকি আনুষ্ঠানিক উদযাপনেই সীমাবদ্ধ থাকছি? প্রতিবছরের মতো এবারও জাতীয় পতাকা, কুচকাওয়াজ, সামরিক সরঞ্জামের প্রদর্শনী সবই ছিল। কিন্তু এসব আয়োজনের আড়ালে কি আমরা রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের শক্তি, দুর্বলতা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে গভীর আলোচনা করেছি?১৯৭১ সালে যে স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম, তার মূল লক্ষ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন। সেই লক্ষ্যপথে বাংলাদেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন করেছে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, কৃষি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, তৈরি পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক অবস্থান এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ এসবই দেশের অগ্রগতির দৃশ্যমান চিত্র। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সড়ক ও সেতু নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়নও দেশের গতিশীলতার প্রমাণ বহন করে। সামাজিক সূচকেও বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে! এই অর্জনগুলো কি একটি শক্তিশালী, টেকসই ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনের জন্য যথেষ্ট? উন্নয়নের এই বাহ্যিক চিত্রের পেছনে যে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, তা কি আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছি?বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরেই গভীর মেরুকরণে আক্রান্ত। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী শক্তির মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইন প্রণয়ন অনেক সময় জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে দলীয় স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়। নতুন আইন প্রণয়ন কিংবা পুরনো আইন বাতিল এসব প্রক্রিয়া প্রায়ই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ বা দুর্বল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এমন অভিযোগ জনমনে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এর ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার পথ বাধাগ্রস্ত হয়।রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হলো তার জনগণ ও ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই জায়গায় এসে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাংলাদেশ কি তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগীভাবে গড়ে তুলতে পেরেছে? স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে সুনাম অর্জন করেছে, যা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। কিন্তু দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সাইবার নিরাপত্তা, নৌ ও বিমান শক্তির উন্নয়ন এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।প্রতিবছরের সামরিক কুচকাওয়াজে যুদ্ধবিমান, ট্যাংক বা রকেট লঞ্চার প্রদর্শন নিঃসন্দেহে একটি প্রতীকী শক্তির বার্তা দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো শুধুমাত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে একটি দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন সমন্বিত কৌশল, গবেষণা ও উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি। বিশ্ব যখন দ্রুত গতিতে সামরিক প্রযুক্তিতে অগ্রসর হচ্ছে ড্রোন যুদ্ধ, সাইবার ওয়ারফেয়ার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তখন বাংলাদেশকে সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে অনেক বেশি পরিকল্পিত ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিতে হবে।এছাড়া সীমান্ত নিরাপত্তাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, সীমান্তে সংঘাত, চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সুসংহত ও কৌশলগত পরিকল্পনা অপরিহার্য। শুধু সামরিক শক্তি নয়, কূটনৈতিক দক্ষতা ও আঞ্চলিক সহযোগিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।তবে শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা বা রাজনীতি নয় রাষ্ট্রের ভেতরের শাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি, জবাবদিহিতার অভাব এবং আইনের শাসনের দুর্বলতা একটি দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তা সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, বাংলাদেশ কি সত্যিই আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পেরেছে? স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস বা অন্যান্য জাতীয় দিবসগুলো কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি এসব দিন আমাদের জন্য আত্মবিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করে? একটি পরিণত রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের ভুল-ত্রুটি স্বীকার করা এবং সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতা অত্যন্ত জরুরি।বাংলাদেশের সম্ভাবনা অস্বীকার করার উপায় নেই। তরুণ জনগোষ্ঠী, ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক গতিশীলতা সবই দেশের জন্য বড় সম্পদ। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা।স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এসে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ রয়েছে নিজেদের অর্জনকে আরও শক্তিশালী করা এবং ব্যর্থতাগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া। আনুষ্ঠানিক উদযাপনের পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন, যেখানে রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা সব ক্ষেত্রেই একটি সুসংহত ও টেকসই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা হবে।পরিশেষে বলা যায়, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কেবল একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নয়; বরং একটি কার্যকর, ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ কতটা এগিয়েছে এবং কতটা পিছিয়ে তার সৎ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নই হতে পারে আগামী দিনের পথনির্দেশনা।এসআর/আবুল কালাম আজাদ, যুক্তরাষ্ট্র

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
ভালুকায় তালাবদ্ধ ঘর থেকে নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার, স্বামী পলাতক
ভালুকায় তালাবদ্ধ ঘর থেকে নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার, স্বামী পলাতক

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় তালাবদ্ধ একটি ঘর থেকে সাবিনা আক্তার (৪২) নামে এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর Read more

পত্রিকা: ‘ইসির পর্যবেক্ষক সংস্থার ঠিকানায় মিলল জঙ্গল, দোকান, বাড়ি’
পত্রিকা: ‘ইসির পর্যবেক্ষক সংস্থার ঠিকানায় মিলল জঙ্গল, দোকান, বাড়ি’

অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম, হৃদরোগ দিবস এবং রাজনীতির নানা খবর ঠাঁই পেয়েছে সোমবার ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর শিরোনামে। সাথে এশিয়া কাপ Read more

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আরও ৩৭৫ জন
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আরও ৩৭৫ জন

সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৭৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তবে এই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু Read more

ঢাকার বাতাস আজ অস্বাস্থ্যকর
ঢাকার বাতাস আজ অস্বাস্থ্যকর

রাজধানী ঢাকার বাতাসে বেড়েছে দূষণ। সাধারণত বৃষ্টির সময় বা বর্ষাকালে ঢাকায় দূষণের মাত্রা কম থাকে। অথচ কিছুদিন ধরে বৃষ্টি হলেও Read more

এনসিপির কমিটি গঠনে জেলা-উপজেলা আহ্বায়কের বয়স নির্ধারণ
এনসিপির কমিটি গঠনে জেলা-উপজেলা আহ্বায়কের বয়স নির্ধারণ

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আহ্বায়কের বয়স সর্বনিম্ন ৪০ বছর হতে হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন