পবিত্র ঈদুল ফিতর মানেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা। কিন্তু কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরে বোরো আবাদে ব্যস্ত থাকা প্রায় ২৫ হাজার ‘জিরাতি’ (বসতি স্থাপনকারী কৃষক) কৃষকের ভাগ্যে এবারও জোটেনি সেই আনন্দ। একাকীত্বের যন্ত্রণা আর ফসলের মায়ায় খোলা আকাশের নিচে অস্থায়ী ছাপরা ঘরেই তাঁদের কাটছে ঈদের দিন।সরেজমিনে দেখা যায়, হাওরের বুকজুড়ে সবুজের সমারোহ। সেই সবুজের মাঝেই ছোট ছোট ছাপরা ঘরে জিরাতিদের অস্থায়ী বসতি। কার্তিক থেকে বৈশাখ—এই ছয় মাস নিজের ঘরবাড়ি ও আত্মীয়স্বজন ফেলে তাঁরা হাওরে অবস্থান করেন। নেই বিদ্যুৎ, নেই সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা। গবাদিপশুর সঙ্গে গাদাগাদি করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়েই দিন-রাত কাটছে এই খাদ্য সৈনিকদের।জিরাতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের প্রধান সংকট সুপেয় পানির। নিরুপায় হয়ে নদীর পানি পান করতে হয়, যা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। খোলা জায়গায় প্রাকৃতিক কাজ সারতে হয় তাঁদের। করিমগঞ্জ থেকে আসা কৃষক আফতু মিয়া বলেন, “ঈদের সময় পরিবারকে খুব মনে পড়ে। কিন্তু ফসল বাঁচাতে এখানে থাকতেই হয়। আয় তেমন নেই, উল্টো ঋণের চাপ বাড়ছে।” তাড়াইল থেকে আসা খাইরুল ইসলাম জানান, রাতের বেলা গরু-ছাগলের সঙ্গে থাকতে হয়, খাবার পানি ও টয়লেটের কোনো ব্যবস্থা নেই।হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টির প্রকোপ বেড়েছে। অনেক সময় আকস্মিক বন্যায় ফসলহানির ঘটনাও ঘটে। তবুও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বছরের পর বছর ধরে বাপ-দাদার এই পেশা ধরে রেখেছেন তাঁরা।কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান জিরাতিদের দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে জানান, “জেলা সমন্বয় কমিটির মিটিংয়ে আমি জিরাতিদের অমানবিক জীবনযাপনের বিষয়টি তুলে ধরেছি। তাঁদের সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করার জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে তাঁদের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাওরের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ আবাসন ও মৌলিক চাহিদাগুলো নিশ্চিত করা গেলে কৃষি উৎপাদনে আরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং তাঁদের জীবনমান উন্নত হবে।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
