রোজার মাস ত্যাগ, সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস। ইফতারে যখন অনেকের ঘরে রকমারি আয়োজন, ঠিক সেই সময়ে কটিয়াদীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের ঘরে বইছে নিঃশব্দ হাহাকার। ওড়না দিয়ে চোখের পানি মুছতে পারলেও হৃদয়ের গভীরে জমানো অভাবের আক্ষেপ যেন পিছু ছাড়ছে না রশনারা বেগম (৫৩) ও ফিরোজা বেগমের (৪৬) মতো অসংখ্য নারীর।কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের শেষ সীমানায় আড়িয়াল খাঁ নদীঘেঁষে গড়ে ওঠা সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের চিত্র এটি। শুধু এখানেই নয়, উপজেলার প্রায় সবগুলো আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের জীবন কাটছে চরম অনাহারে-অর্ধাহারে। অভাবের তাড়নায় ঝোপঝাড়ের লতাপাতা আর যৎসামান্য সবজি যা জোটে, তা দিয়েই সেহরি ও রাতের খাবার খেয়ে কোনোমতে টিকে আছেন তাঁরা। ২৬ রমজান পার হলেও সামর্থ্যের অভাবে এক গ্লাস পানি ছাড়া জোটেনি পুষ্টিকর কোনো ইফতার।সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, রশনারা বেগম দুই নাতিকে নিয়ে থাকেন। তাঁর স্বামী রুকন উদ্দীন ও দুই ছেলে ঢাকায় রিকশা চালিয়ে বা দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু ঈদে বাড়ি আসা তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় খরচও পাঠাতে পারছেন না তাঁরা। রশনারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “বাবা, রোজার দিনগুলোতে একটা দিনও পানি ছাড়া ইফতার করতে পারিনি। জঙ্গল থেকে এইডা-হেইডা এনে রান্না করে খাই। আমাদের ঈদ নাই, কেউ আমাদের খোঁজও নেয় না।”একই অবস্থা ফিরোজা বেগমেরও। নিঃসন্তান এই নারীর বৃদ্ধ স্বামী মহর উদ্দিন অসুস্থ। তিনি বলেন, “একবেলা খেয়ে রোজা রাখছি। ইফতার বলতে শুধু পানি। সারা মাসে একটু মনভরে খেতে পারিনি।”এখানে মোট ১৬৬টি ঘর বরাদ্দ থাকলেও কর্মসংস্থানের অভাবে ৭০-৮০টি পরিবার তালা দিয়ে কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে গেছে। যারা আছেন, তাঁদের কাছে ঈদের আনন্দ যেন এক অলীক স্বপ্ন। প্রতিবন্ধী হানিফ মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “তিন ছেলেমেয়ে ঈদের জামাকাপড়ের জন্য আবদার করছে। নিজেরা চলতেই পারি না, ওদের কাপড় দেব কীভাবে? ঈদের দিন একবেলা ভালো খাবার দেওয়ার সামর্থ্যও আমার নেই।”আরেক বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, ঘর পেলেও জীবন চালানোর মতো কোনো কর্মসংস্থান নেই এখানে। নদী পাশে থাকলেও মাছ ধরার সুযোগ নেই। মমতা বেগম নামের এক নারী বলেন, “স্বামী অসুস্থ থাকায় কাজ বন্ধ। কেউ সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসলে আমাদের উপকার হতো। সরকারি বা বেসরকারি কোনো সাহায্য এখনও পাইনি।”এ বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আবুল খায়ের বলেন, “আমাদের কাছে এই মুহূর্তে সহায়তা করার মতো কোনো বরাদ্দ নেই। তবে ভাতার আওতায় আসার মতো কেউ থাকলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। বিষয়টি যেহেতু অবগত হয়েছি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে উদ্যোগ গ্রহণ করব।”কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, “সবাইকে ঢালাওভাবে সহায়তা করার মতো বরাদ্দ বর্তমানে নেই। তবে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকজনকে সহায়তা প্রদান করা হবে। বাকিদের জন্য পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
