কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার থাইংখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে ভুয়া বা জাল কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ ব্যবহার করে শিক্ষকতা করার প্রমাণ সামনে এসেছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষা নিরীক্ষা ও পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএ) দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ যাচাই-বাছাই করে একটি তালিকা প্রকাশ করলে সেখানে তার নামও উঠে আসে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষা প্রশাসন, স্থানীয় শিক্ষাঙ্গন এবং সচেতন মহলের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা নিয়োগের সময় যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ জমা দিয়েছেন, সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সম্প্রতি একটি বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ওই কার্যক্রমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সনদের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ডাটাবেজ ও রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। এই যাচাই প্রক্রিয়ায় যেসব সনদের সত্যতা পাওয়া যায়নি বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি, সেগুলোকে জাল/ভূয়া সনদদারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।ডিআইএ প্রকাশিত ওই তালিকা অনুযায়ী, উখিয়ার থাইংখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ মোস্তফা কামালের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তালিকায় তার ইনডেক্স নম্বর ১০২৮০৯৭ উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি সামনে আসার পর তার জমা দেওয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রকাশিত তথ্য ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, থাইংখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের আগে মোস্তফা কামাল পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তিনি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ হিসেবে একটি সনদ জমা দিয়ে শিক্ষক পদে নিয়োগ লাভ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক নিরীক্ষায় দেখা যায়, ওই সনদের কোনো সত্যতা নেই এবং জাল/ভূয়া সনদ।মোস্তফা কামাল তার কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ হিসেবে বগুড়াভিত্তিক জাতীয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি (নেকটার)-এর নাম উল্লেখ করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, “মোস্তফা কামাল” নামে উক্ত সনদের কোনো প্রশিক্ষণার্থী বা উত্তীর্ণ ব্যক্তির তথ্য তাদের অফিসিয়াল রেকর্ডে পাওয়া যায়নি। এমনকি প্রতিষ্ঠানের অনলাইন ডাটাবেজেও তার নামে কোনো নিবন্ধন বা সনদ সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।শিক্ষা প্রশাসনের একাধিক সূত্র বলছে, সরকারি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। যদি কেউ জাল বা ভুয়া সনদ ব্যবহার করে নিয়োগ লাভ করেন, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং আইনের দৃষ্টিতে প্রতারণা ও জালিয়াতির শামিল।এদিকে স্থানীয় সূত্রে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, মোস্তফা কামালের নিজস্ব একটি কম্পিউটার দোকান রয়েছে, যার নাম “মোস্তফা কম্পিউটার”। স্থানীয়দের দাবি, ওই দোকান থেকেই বিভিন্ন সময় জাল বা ভুয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ সহ আরও বিভিন্ন ধরনের জাল বা ভুয়া সনদ তৈরি করা হয়েছিল এবং বর্তমানেও হয়ে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এমন জাল বা ভুয়া সনদ তৈরি করে দেওয়া হয়, যার অধিকাংশের কোনো অনলাইন নিবন্ধন বা সরকারি স্বীকৃতি নেই।স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের কন্ঠস্বর-কে জানিয়েছেন, বহু চাকরিপ্রার্থী বিভিন্ন সময় ওই দোকানের মালিক মাস্টার মোস্তফা কামালের কাছ থেকে ১০/১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ সংগ্রহ করেছেন। তবে এসব সনদ গুলোরই বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যেসব শিক্ষক জাল বা ভুয়া সনদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন, তাদের কাছ থেকে সেই অর্থ সরকারকে ফেরত দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনার মধ্যে মোস্তফা কামালের কাছ থেকে আদায় যোগ্য টাকার পরিমাণ হচ্ছে ২০,৯৭,৪৩০ টাকা। তিনি সেই টাকাও এখনো পরিশোধ করেননি।একটি বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, মোস্তফা কামাল চাকরি হারানোর ভয়ে জাল বা ভুয়া সনদের বিষয়টি অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ঢাকা হেড অফিস এবং বিভাগীয় অফিসে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেছেও বলেও গুঞ্জন রয়েছে।এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে মোস্তফা কামাল অভিযোগ অস্বীকার করে সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা সঠিক নয়। আমি যে সনদ ব্যবহার করেছি তা বৈধ। কোনো ভুল বোঝাবুঝি হলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা করা হবে।”কথার এক পর্যায়ে জাল বা ভুয়া সনদদারী শিক্ষক মোস্তফা কামাল বলেন, আপনি নিউজ করিয়েন না। আমার একটা সম্মান আছে, নিউজের কারণে আমার সম্মান চলে যাবে। আপনার বিকাশ নম্বর কোনটা বলুন, আমি কিছু খরচ পাঠিয়ে দেব।এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অ্যাডভোকেট মাহমুদ ইসলাম সুমন সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, জাল সনদ ব্যবহার করে সরকারি চাকরি লাভ করা বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে গুরুতর অপরাধ।বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা অনুযায়ী প্রতারণার মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়া একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এই ধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।এছাড়া ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারা অনুযায়ী জাল দলিল তৈরি করা বা জাল দলিল ব্যবহার করা গুরুতর অপরাধ। এসব ধারায় দোষী প্রমাণিত হলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এমনকি কিছু ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।তিনি আরও বলেন, যদি কেউ জাল সনদ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন, তাহলে সরকার সেই অর্থ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি প্রশাসনিকভাবে চাকরিচ্যুত করার ক্ষমতাও রাখে।একই প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলার শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফার বক্তব্যর জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কক্সবাজার জেলার শিক্ষা অফিসের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তালিকায় যেসব শিক্ষকের নাম এসেছে, তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সারা দেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের জমা দেওয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদের সত্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবেই এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। যেসব সনদের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রেকর্ডের সঙ্গে মেলেনি, সেগুলোকে সন্দেহজনক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে আরও তদন্ত করা হবেএসআর

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
পেট্রোল মজুদ করে চড়া দামে বিক্রি, ব্যবসায়ীর জেল-জরিমানা
পেট্রোল মজুদ করে চড়া দামে বিক্রি, ব্যবসায়ীর জেল-জরিমানা

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় অবৈধভাবে পেট্রোল মজুদ ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে এক মুদি ব্যবসায়ীকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করেছে উপজেলা Read more

আমতলীতে বাসের চাপায় শ্রমিক নিহত
আমতলীতে বাসের চাপায় শ্রমিক নিহত

বরগুনার পটুয়াখালী–কুয়াকাটা মহাসড়কের চুনাখালী সেতুর কাছে সাকুরা পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নির্মাণ শ্রমিক শুভ হাওলাদার (৪৫) নিহত হয়েছেন।শুক্রবার (১৫ আগস্ট) Read more

পররাষ্ট্রনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট: ওমান
পররাষ্ট্রনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট: ওমান

নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির ওপর আমেরিকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাঈদি।ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টে লেখা এক নিবন্ধে ওই Read more

নতুন দল নিবন্ধনে মাঠপর্যায়ে ইসির তদন্ত দল, সময়সীমা ৩১ আগস্ট
নতুন দল নিবন্ধনে মাঠপর্যায়ে ইসির তদন্ত দল, সময়সীমা ৩১ আগস্ট

নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য ২২টি দলকে মাঠ পর্যায়ে পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এসব দলের জেলা ও উপজেলা Read more

ঢাকা-১০ আসনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেন আসিফ মাহমুদ
ঢাকা-১০ আসনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেন আসিফ মাহমুদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে অংশ নিতে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন সাবেক উপদেষ্টা ও জুলাই Read more

চকরিয়ায় যানজটের ভোগান্তি
চকরিয়ায় যানজটের ভোগান্তি

যানজটের ভোগান্তি থেকে কোনোমতেই রেহাই পাচ্ছেন না কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরশহরের মানুষ। ব্যস্ততম চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া পৌরশহর চিরিঙ্গার দুই পাশের ফুটপাত Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন