চট্টগ্রাম নগরের অভিজাত আবাসিক এলাকা চকবাজার থানার চন্দনপুরা শুক্রবার ভোরে পরিণত হয় আতঙ্কের জনপদে। ফজরের আজানের আগমুহূর্তে স্মার্ট গ্রুপের স্বত্বাধিকারী, ১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে একদল মুখোশধারী সন্ত্রাসী গুলি ছোড়ে। মুহূর্তের মধ্যে ঘুমন্ত এলাকা কেঁপে ওঠে গুলির শব্দে। আতঙ্কে ঘরবন্দি হয়ে পড়েন আশপাশের বাসিন্দারা।পুলিশ জানায়, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে একটি মাইক্রোবাসে করে অন্তত আটজন সন্ত্রাসী ঘটনাস্থলে আসে। বাড়ির সামনে ও পেছনের অংশে অবস্থান নিয়ে তারা একাধিক রাউন্ড গুলি ছুড়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। ঘটনার সময় মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়ির ভেতরেই ছিলেন। তবে গুলিবর্ষণে কেউ হতাহত হয়নি। এই ঘটনায় প্রাণহানি না ঘটলেও নগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ভয় ও অনিশ্চয়তা।চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার হোসাইন কবির ভূঁইয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সময়ের কন্ঠস্বর-কে জানান, চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যেই এই গুলিবর্ষণ চালানো হয়েছে। একটি দুবাইভিত্তিক বিদেশি নম্বর থেকে ভুক্তভোগীকে একাধিকবার ফোন করে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। দাবি মানা না হওয়ায় এই হামলা চালানো হয়।উপকমিশনার আরও জানান, প্রাথমিক তদন্তে হামলাকারীরা চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী বাহিনীর অনুসারী বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, প্রায় দেড় মাস আগে একটি বিদেশি নম্বর থেকে তাকে যোগাযোগ করতে বলা হয়। ফোনকারী নিজেকে বড় সাজ্জাদের লোক হিসেবে পরিচয় দেয়। তিনি বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি এবং কাউকে কিছু জানাননি। তাঁর ভাষ্যমতে, “দুইবার ফোন করা হয়েছিল। আমি বিষয়টি এড়িয়ে যাই। আজ ভোরে ঘুমিয়ে ছিলাম, হঠাৎ গুলির শব্দে পুরো পরিবার আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।”উল্লেখ্য, মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন প্রভাবশালী নেতা। তিনি গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগে চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যবসায়িক অবস্থান, দুটো মিলিয়েই তিনি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একজন ব্যক্তিত্ব।পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা সাজ্জাদ আলী ওরফে সাজ্জাদ হোসেন খান দেশের অন্যতম ভয়ংকর সন্ত্রাসী। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করেই চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। ইন্টারপোল ঘোষিত মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা এই সন্ত্রাসীর নির্দেশেই নগরের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, খুন ও অস্ত্রের মহড়া চলে বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।পুলিশ জানায়, চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশসহ নগরের গুরুত্বপূর্ণ থানা এলাকা এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ অন্তত পাঁচটি থানা এলাকায় সাজ্জাদ বাহিনীর প্রভাব রয়েছে। এই নেটওয়ার্কের কারণে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। চাঁদা না দিলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোই এই বাহিনীর পুরোনো কৌশল।গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে চট্টগ্রাম জেলায় সংঘটিত জোড়া খুনসহ অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে সাজ্জাদ বাহিনীর অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। পুলিশ বলছে, কখনো আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রতিপক্ষকে হত্যা করা হচ্ছে, আবার কখনো টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে খুনি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই বাহিনীর সদস্যরা।সন্ত্রাসী সাজ্জাদের অপরাধজগতে উত্থান ঘটে ১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান হত্যার পর। সাক্ষীর অভাবে ওই মামলায় তিনি খালাস পেলেও নগরের অপরাধজগতে তার নাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ছয় নেতা-কর্মীসহ আটজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যার ঘটনায়, যা ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত, নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। একই বছরের অক্টোবরে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে ২০০৪ সালে দেশ ছাড়েন তিনি।এরপর থেকেই বিদেশে বসে তিনি বাহিনী পরিচালনা করে আসছেন। যদিও আলোচিত ‘এইট মার্ডার’ মামলাসহ একাধিক মামলায় তিনি পরবর্তীতে খালাস পান, তবে পুলিশের দাবি, মাঠের বাস্তবতায় তার বাহিনীর সন্ত্রাস কখনো থামেনি।শুরুতে নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলী ও ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে এই বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। ম্যাক্সনের মৃত্যু, সরোয়ারের দলত্যাগ ও পরবর্তী সময়ে তার হত্যাকাণ্ড, সব মিলিয়ে বাহিনীর ভেতরে রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বও কম হয়নি। ২০১৫ সাল থেকে ‘বুড়ির নাতি’ খ্যাত ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে থাকলেও বাহিনীর অপারেশন থেমে নেই।পুলিশ জানায়, গত ১৫ মার্চ ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেয় ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমন। তাদের অধীনে অন্তত ৫০ জন শ্যুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে, যাদের অধিকাংশই অস্ত্র ব্যবহারে পারদর্শী। বিদেশে অবস্থানরত বড় সাজ্জাদ নিয়মিত ফোনে নির্দেশনা দিয়ে এই বাহিনী পরিচালনা করছেন বলে দাবি পুলিশের।এনআই

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
আশুলিয়ায় লরি চাপায় নারী-শিশুসহ নিহত ৩
আশুলিয়ায় লরি চাপায় নারী-শিশুসহ নিহত ৩

আশুলিয়ায় লরি চাপায় নারী ও শিশুসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও একজন। এ ঘটনায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে Read more

বর্তমানে পাহাড়ের অবস্থা শান্ত রয়েছে: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
বর্তমানে পাহাড়ের অবস্থা শান্ত রয়েছে: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

বর্তমানে পাহাড়ের অবস্থা শান্ত রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খাগড়াছড়ির Read more

ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাজ্য
ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাজ্য

পশ্চিম তীরের কয়েকজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী (সেটেলার) এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাজ্য।গাজায় নতুন সামরিক অভিযান না বন্ধ Read more

সীমান্তে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র ফের সক্রিয়, আটক ১২
সীমান্তে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র ফের সক্রিয়, আটক ১২

কক্সবাজারের টেকনাফে উপকূলীয় এলাকার বেশ কয়েকটি পয়েন্টে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই চক্রের সদস্যরা দেশের বাইরে থাকা Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন