টানা শৈত্যবাহে কাঁপছে যশোরের সীমান্তবর্তী শার্শা-বেনাপোল। গত এক সপ্তাহ ধরে অব্যাহত শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গে কুয়াশা ও হিমেল হাওয়া শীতের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে গ্রামে শহরে জেঁকে বসেছে তীব্র শীত। ‘পৌষের শীত তোষের গায়, মাঘের শীতে বাঘ পালায়’ প্রবাদটির সাথে এবারের শীতের মিল খুঁজে পাওয়া গেছে এ অঞ্চলে। সব মিলিয়ে বাঘ কাঁপানো মাঘের শীতের আভাস দিচ্ছে পৌষের মাঝামাঝিতে। একইসঙ্গে চলতি মৌসুমের দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও বিরাজ করছে এ জেলায়। বৃহস্পতিবার (০১ জানুয়ারি) যশোরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এদিন যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বুধবারও যশোরে একই তাপমাত্রা বিরাজ করে। চলতি মৌসুমে এর আগে আরও দু’দিন যশোরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যশোর আবহাওয়া অফিস।শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গে উত্তরের হিমেল হাওয়ায় যেন হাড়েও কাঁপন লাগছে। শৈত্যপ্রবাহের পাশাপাশি হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা পড়ছে। শেষ রাত থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত ঘন কুয়াশা সৃষ্টি হয়। ঘন কুয়াশার কারণে সড়কে যানবাহনগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। বেলা বাড়লে এর মাত্রা অনেকটা কমলেও হালকা ধরনের কুয়াশা চোখে পড়ছে। এছাড়া মেঘের আড়াল থেকে মাঝে মাঝে সূর্য উঁকি দিলেও তাপ ছড়াচ্ছে না। ঠান্ডার দাপটের কাছে যেন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে সূর্যটাও। কনকনে শীতে শ্রমজীবী মানুষ ও প্রাণীকুলের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। দিনভর সূর্যের আলোর দেখা না মেলায় শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। কনকনে শীতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। শীতে একদম জবুথবু অবস্থা। পৌষের শীতে মানুষ রীতিমতো কাঁপছে। প্রচন্ড এই শীতে ঠান্ডাজনিত রোগও বেড়েছে। শীতবস্ত্রের দোকানেও ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।যশোরে তীব্র এই ঠান্ডার কারণে কৃষকরা বোরের বীজতলায় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। প্রচন্ড এই ঠান্ডা আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকলে বীজতলা ‘কোল্ড স্ট্রোকে’ বিনষ্টের দুশ্চিন্তা করছেন। আলু ও সরিষা যারা আবাদ করেছেন তারাও ঠান্ডা ও কুয়াশায় চারা নষ্টের আশঙ্কা করছেন।এদিকে প্রচন্ড শীতের কারণে মানুষজনের স্বাভাবিক কর্মকান্ড ব্যাহত হচ্ছে। মোটা জ্যাকেট, মাফলারে ঢেকে মানুষজনকে জবুথবু হয়ে পথ চলতে দেখা যায়। হাড় কাঁপানো শীতে ঘর থেকে বের হননি অনেকে। শীতের কারণে সারাদিনই গরম পোশাক পরে মানুষজনকে চলাচল করতে দেখা যায়। সন্ধ্যার পর থেকে বাজারে, চায়ের দোকানে মানুষের উপস্থিতি কমতে শুরু করে। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শীত জেঁকে বসায় অনেকেই বাড়ির সামনে বা রাস্তার পাশে খড়খুটোতে আগুন জ্বালিয়ে শরীরে তাপ নিচ্ছেন। ঘরের মধ্যে শীত কিছুটা কম হলেও বাইরে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। তাই কয়েকজন মিলে আগুন জ্বালিয়ে শীত তাড়ানোর চেষ্টা করছে অনেকে।তবে শৈত্যপ্রবাহ হলেও ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই শ্রমজীবী মানুষের। শীতের দাপটে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। জীবন জীবিকার তাগিদে শীত উপেক্ষা করে তাদের রুটি রুজির সন্ধানে ঘরের বাইরে বের হতে হচ্ছে। হাড় কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে ভোরের আলো ফুটতেই কাজের জন্য বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়ছেন তারা। বেনাপোল ভবারবেড় মসজিদের সামনে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ জন মানুষ শ্রম বিক্রির জন্য জড়ো হয়ে থাকেন। প্রচন্ড শীতে সেই সংখ্যা অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে। তারপরও কাজ না পাওয়ায় অনেকেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। কিছু মানুষ অনেক বেলা অবধি অপেক্ষা করছেন কাজের আশায়। ঘিবা এলাকার আকবার আলী বলেন, শীতে একদিন কাজ পাই তো, তিনদিন পাই না। গত এক সপ্তাহ ধরে কাজ হচ্ছে না। শীতের মধ্যে প্রতিদিন ভোরবেলায় এসে বসে থেকেও কোনো লাভ হচ্ছে না।ছোট আঁচড়া গ্রামের নির্মাণ শ্রমিক আয়নাল বলেন, শীতে বাইরে দাঁড়াতে পারছি না। অনেক কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু উপায় নেই। কাজের সন্ধানে বের হয়েছি। ঠিকমতো কাজও পাচ্ছি না।বাহাদুরপুর এলাকার শ্রমজীবী কামাল উদ্দিন বলেন, বিল্ডিংয়ের রঙের কাজ করি। কাজের সন্ধানে এসেছি। এখানে বসে আছি। এখনো কাজ পাইনি। শীতের ভেতরে অনেক কষ্ট হচ্ছে। পেটের দায়ে ঘরের বাইরে বের হয়েছি। কাজ পাবো কি না জানি না।বেনাপোল রেলস্টেশনের ইজিবাইক চালক হানিফ মিয়া বলেন, শীতে ঘরে থেকে মানুষ বের হচ্ছে খুবই কম। ট্রেনেও যাত্রী অনেক কম এসেছে। এজন্য যাত্রী পাচ্ছি না। আয় রোজগারও কমেছে। খুবই কষ্টে দিন পার করছি।বেনাপোল স্থলবন্দরের হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক সহিদ আলী জানান, আমাদের অনেক শ্রমিকরা প্রচুর শীতের কারণে কাজে আসতে পারছে না। মালামাল লোড আনলোডে অনেক কস্ট হচ্ছে। তারপরও শ্রমিকরা তাদের কাজ করছে পেটের দায়ে।অপরদিকে শীতের তীব্র প্রকোপের সঙ্গে বেশির ভাগ শিশুরা জ¦র, সর্দি, হাঁচি, কাশি, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বয়স্ক মানুষরাও শীতজনিত রোগে পড়ছেন। নাভারন ৫০ শয্যা হাসপাতালের মেডিসিন ও শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেড়েছে। বর্হিবিভাগ থেকেও শীতজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষ চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন।শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার তৌফিক পারভেজ জানান, হাসপাতালে শীতজনিত রোগী বেড়েছে। তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। শীতজনিত রোগ থেকে রক্ষা করতে শিশুর বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। গরম পানি পান করাসহ গরম কাপড়, হাত ও পায়ে মোজা পরাতে হবে। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত থেকে কোনো বয়সের মানুষ ঝুঁকিমুক্ত নয়। তাই সকলকে সচেতন হতে হবে।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
