১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মেলে লাল সবুজের পতাকা ও স্বাধীন রাস্ট্র। দেশকে বাচাঁতে সেদিন যারা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল তাদের মধ্যে ছিলেন জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর কো অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬৬ শিক্ষার্থী। পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে লড়াই করেছেন তারা। বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন ওই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র বশির আহমেদ, নূর ইসলাম ও মতিউর রহমান।জানা যায়, জামালপুর জেলার সর্ব উত্তরে ভারতীয় সীমান্তবর্তী বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর। কামালপুরের পাশেই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মহেন্দ্রগঞ্জ। মহান মুক্তিযুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের এ মহেন্দ্রগঞ্জ। কৌশলগত কারনে ধানুয়া কামালপুর ছিলো পাক হানাদার বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ন স্থান। যে কারণে কামালপুরে ঘাঁটি গেড়েছিল পাকিস্থানী বাহিনী। কামালপুর দখলে নিতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সম্মুখ যুদ্ধে পা হারান কর্ণেল আবু তাহের। শহীদ হন ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজসহ শতাধিক বীর যোদ্ধা। এক সময় অবস্থা বেগতিক দেখে ৪ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় পাকিস্থানী বাহিনী। মুক্ত হয় ধানুয়া কামালপুর। কামালপুরে এমন বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাবে বীর বিক্রম, বীর উত্তম ও বীর প্রতীক খেতাব পান মোট ২৯ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।১৯৭১ সালের সে সময়টায় বিভিন্ন সেক্টর ও সাবসেক্টরে ভাগ করা হয় পুরো দেশকে। মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন কোম্পানিতে মুক্তিযোদ্ধা নিয়োগ চলছে এমন খবর চলে আসে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা নাম লেখাতে শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। একে একে ৬৬ জন শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য প্রশিক্ষণ নিতে ছুঁটে গেলেন ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জে। প্রশিক্ষণ নিয়েই ঝাপিয়ে পড়েন শত্রুবাহিনীর ওপর। দীর্ঘ ৯ মাস বীরের মত লড়াই করে ছিনিয়ে আনেন লাল সবুজের পতাকা।  বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চবিদ্যালয়ে আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। দেশের পরিস্থিতি আমরা বুঝে গিয়েছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক আমাদের কাছেও পৌঁছে গেছে। প্রামাঞ্চল হলেও নানা মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের খবর পাচ্ছিলাম। আর ওপাশেই ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জ, সেখানে গিয়ে দেখতাম যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। আমাদের বয়সী অনেকেই যুদ্ধে যাচ্ছে, নিজেকে ঘরে রাখা কঠিন হয়ে গেল। চলে গেলাম মুক্তিযুদ্ধে। আমাদের স্কুলের ৬৬ জন ছাত্র মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়।’জানা যায়, ৪ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার হরদেব সিং ক্লের বললেন- কামালপুর পাকিস্থানি ক্যাম্পে কে যাবে আত্মসমর্পণের চিঠি নিয়ে। কামালপুর সীমান্তঘেষাঁ ভারতীয় গ্রাম ব্রাহ্মণপাড়ায় তখন মুক্তি বাহিনীর হাজারো সদস্য উপস্থিত। তবে কেউ সাহস করে বলতে পারছিলো না কে যাবে। বিগ্রেডিয়ার ক্লের যখন প্রশ্নটা দ্বিতীয়বার করলেন, ঠিক তখনই মুক্তিবাহিনীর এক কিশোর যোদ্ধা বলে উঠলেন, আমি যাব চিঠি নিয়ে। সেই কিশোর যোদ্ধা সাহসী বশির আহমেদ।বশির আহমেদ বলেন, ‘আমাদের স্কুলের ১০০ গজ দূরেই ক্যাম্পটি। আত্মসমর্পণের চিঠিটি পকেটে নিয়ে পাকিস্থানি ক্যাম্পের সামনের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আমার হাতে থাকা সাদা পতাকা নাড়ালাম। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া পেলাম না। ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় পড়ে গিয়েছিলাম। কারণ, শত্রুপক্ষের ছোড়া একটি গুলিই আমার জীবন কেড়ে নিতে পারত। তবে কোণঠাসা পাকিস্থানী বাহিনী একসময় ক্যাম্পের ভেতরে আমাকে ডেকে নেয়। আমি আত্মসমর্পণের চিঠি পৌঁছে দেই বিওপির কমান্ডার ক্যাপ্টেন আহসান মালিকের হাতে। দীর্ঘক্ষণ চিঠির বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেও সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না পাক বাহিনী। এরই মধ্যে মিত্রবাহিনীর চারটি যুদ্ধবিমান হামলা শুরু করল পাকিস্থানী ক্যাম্পে। আমাকে বাংকারে ঢোকানো হলো। কয়েকজন সৈনিক হতাহত হলো। পাকিস্থানী বাহিনীর মনোবল আরও ভেঙে গেল। এরই মধ্যে মুক্তিবাহিনীর আরও একজন এলেন আত্মসমর্পণের চিঠি হাতে। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা আনিসুর রহমান। চারপাশ থেকে হামলায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী। শত্রুমুক্ত হয় কামালপুর রণাঙ্গন।’বিদ্যালয়টির বর্তমান প্রধান শিক্ষক ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আমি গর্বিত যে আমার এ বিদ্যালয়ের ৬৬ জন প্রাক্তন ছাত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৬৪ সালে এ স্কুল প্রতিষ্ঠার সময় আশপাশের এলাকায় কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। সবাই কামালপুরেই পড়তে আসতো। প্রায় ৮ শ’ শিক্ষার্থী ছিলো বলে জেনেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গুরুত্তপূর্ণ এক রণাঙ্গন ছিল বলে স্কুলের এত ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বিষয়টি আমাকে প্রতিদিনই সকল কাজে উৎসাহিত করে। আমি গর্বিত এমন ইতিহাস সৃষ্টিকারী একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলে। তিনি আরো বলেন, ১১ নম্বর সেক্টরের এ বিদ্যালয়টির আশানুরুপ উন্নয়ন হয়নি। ক্লাস রুমের সঙ্কট রয়েছে। ইতিহাস রক্ষায় বিদ্যালয়টি আধুনিকায়নের দাবি জানান তিনি।’ধানুয়া কামালপুর ইউপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাপ জামাল বলেন, ‘১৯৬৪ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৭১ সালে এ বিদ্যালয় থেকে ৬৬ জন ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। এটা অবশ্যই ইতিহাসের অংশ। এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি গর্বিত।’ইখা

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
কাতারে ইসরাইলি হামলা নিয়ে তারেক রহমানের বিবৃতি
কাতারে ইসরাইলি হামলা নিয়ে তারেক রহমানের বিবৃতি

কাতারের জনগণ এবং দেশটির আমির শেখ তামিম আল থানির প্রতি দৃঢ় সংহতি প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঙ্গলবার (৯ Read more

জামায়াতের সমাবেশে বিএনপিসহ সব দলকে আমন্ত্রণ
জামায়াতের সমাবেশে বিএনপিসহ সব দলকে আমন্ত্রণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৭ দফা দাবিতে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের আয়োজন করেছে জামায়াতে ইসলামী। সমাবেশ উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী Read more

জীবননগরে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে স্কুলছাত্রীর মৃত্যু
জীবননগরে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে স্কুলছাত্রীর মৃত্যু

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের আবাসন প্রকল্পে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মিতা খাতুন (১২) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (০৯ মে) Read more

তৃণমূলে বিএনপি-জামায়াত টক্কর, দুই দলের নজর আওয়ামী লীগের ভোটে
তৃণমূলে বিএনপি-জামায়াত টক্কর, দুই দলের নজর আওয়ামী লীগের ভোটে

অতীতে নির্বাচনে জামায়াতের যে ভোট তাতে করে দলটি বিএনপিকে আদৌ কোনো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারবে কি-না সে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। Read more

কুমিল্লায় করোনায় এবছরে প্রথম মৃত্যু
কুমিল্লায় করোনায় এবছরে প্রথম মৃত্যু

কুমিল্লায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তি জেলার বুড়িচং উপজেলার কাবিলা এলাকার বাসিন্দা।এবছর এটি কুমিল্লা জেলায় প্রথম করোনায় Read more

আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সম্ভব নয়: শিশির মনির
আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সম্ভব নয়: শিশির মনির

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন