গাজীপুরের ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ পুরো মহানগর জুড়ে ফিটনেসবিহীন ‘তাকওয়া’ মিনিবাসের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা। এ ছাড়াও, চালকের আসনে কিশোর বয়সীরা, তাদের সহকারী হিসেবে যারা আছে, তাদের বেশীর ভাগের বয়স ১৩ থেকে ১৪।গত ২০১৯ সালের আগস্টে যাত্রী-ভোগান্তি কমাতে ‘চক্রাকার বাস সার্ভিস’ হিসেবে চালু হওয়া এ পরিবহন। বর্তমানে দুটি মহাসড়ক ও চারটি রুটে প্রায় দুই শতাধিক বাস নিয়ে দাপটে চলাচল করছে। যার অধিকাংশের নেই রুট পারমিট, ফিটনেস বা বৈধ কাগজপত্র।বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, মহানগরের কোনাবাড়ি এলাকায় তাকওয়া হাইওয়ে মিনিবাসের স্টিয়ারিংয়ে কিশোর বয়সী চালক, আর সহকারীদের বেশির ভাগই ১৩-১৪ বছরের শিশু।অভিযোগ উঠেছে, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দীর্ঘদিন ধরে ‘তাকওয়া পরিবহন’ একের পর এক দুর্ঘটনা, যাত্রী নিগ্রহ, ভাড়া নিয়ে সংঘর্ষ, বেআইনি ও অদক্ষ চালকের দৌরাত্ম্য এবং নারীসহ বিভিন্ন যাত্রী হয়রানির ঘটনায় আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।চন্দ্রা- ত্রিমোড়, সফিপুর, মৌচাক, কোনাবাড়ি, চান্দনা-চৌরাস্তা, সালনা, পোড়াবাড়ি, ভাওয়াল মির্জাপুর, মাস্টারবাড়ি, রাজেন্দ্রপুর ও মাওনা এলাকায় দেখা যায়, বেশিরভাগ মিনিবাসগুলোর স্টিয়ারিংয়ে কিশোর বয়সী চালক, আর সহকারীদের বেশির ভাগই ১৩-১৪ বছরের শিশু।এদিকে, যাত্রী ওঠানামা ও ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও টানাহেঁচড়ার ঘটনাও নিয়মিত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।শিশুশ্রম নিষিদ্ধ আইন ২০১৩-এ ১৮ বছরের নিচের কাউকে গাড়ির চালক বা সহকারী হিসেবে নিয়োগকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু তাকওয়া পরিবহনে শিশু-কিশোর শ্রমিকই মূল চালিকা শক্তি।সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের আগস্ট- সেপ্টেম্বর দুই মাসেই এই রুটে অন্তত ১৮টি বড় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১০ জন। বিভিন্ন সময় এই পরিবহনের চালক- সহকারীদের বিরুদ্ধে যাত্রীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা, ভয়ংকর বেপরোয়া বাসচালনা, বৈধ কাগজপত্র বিহীন গাড়ি পরিচালনা, নাবালক চালকের গাড়ি চালানো এবং যাত্রী নিরাপত্তা লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্তও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি; বরং অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে বিরোধের জেরে একাধিক যাত্রী নিহত, অটোরিকশা চালক নিহতের ঘটনায় মহাসড়ক অবরোধ এবং  পথচারীকে ধাক্কায় মৃত্যু, বেপরোয়া চালনায় একাধিক অটোরিকশা আরোহীর প্রাণহানি, লাইসেন্সবিহীন চালক ও অননুমোদিত গাড়ি পরিচালনার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টে ডজনেরও বেশি মামলাসহ ডাম্পিং, সব মিলিয়ে তাকওয়া পরিবহন হয়ে ওঠে গাজীপুরের পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা, দুঘর্টনা ও আইন বহির্ভূত আচরণের সবচেয়ে আলোচিত পরিবহন প্রতিষ্ঠান।অপরদিকে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটিও একাধিকবার এই পরিবহনকে শহরের যানজট ও সড়ক নিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।উল্লেখ্য, গত ২৬ নভেম্বর দুপুর দেড়টার দিকে চান্দনা চৌরাস্তায় এলাকায় তাকওয়া পরিবহন নামের একটি যাত্রীবাহী বাসের হেলপারের ধাক্কায় ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র আরাফাত সানি আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে ক্ষুব্ধ ছাত্ররা বাসটির জানালার গ্লাস ভাংচুর করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং রাস্তায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন ক্ষুব্ধ ছাত্ররা। এছাড়া ধর্ষণ, যাত্রী হত্যা ও ড্রাইভার- হেলপার মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালনা সহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে তাকওয়া পরিবহন বাসের বিরুদ্ধে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, গাজীপুর জেলা ও মহানগরে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত, প্রশাসনের নির্দেশনা, বিআরটিএর নিয়ম- সবকিছুর পরও ‘অদৃশ্য শক্তির প্রভাব’ ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তাকওয়া পরিবহন আজও শহরে চলাচল করছে দাপটের সঙ্গে। প্রতিদিনই ঝুঁকিতে থাকছে লাখো যাত্রী, এবং রুটে রুটে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চালক, ব্যবসায়ীরা জানান, তাকওয়া পরিবহনের মালিক- স্টাফরা নিয়মিত চাঁদা দেন সড়ক পরিবহন শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের অফিসের লাইন ম্যান ও দায়িত্বরত ব্যক্তির কাছে। এসব টাকার অংশ নাকি যায় হাইওয়ে পুলিশ ও মহানগর ট্রাফিক পুলিশের কিছু কর্মকর্তার পকেটেও। ফলে ফিটনেস বিহীন বাসগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে কোনো সংস্থা দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয় না। আরও জানান, রুট পারমিট বিহীন, ফিটনেসহীন বাস চলাচল করতে হলে বিভিন্ন পর্যায়ে দৈনিক জিপি ও মাসিক চাঁদা দিতে হয় এবং মাসে এক- দুই বার রিকন্ডিশন্ড খাঠাতে পুলিশের নামে গাড়ি দিতে হয়। এতে পরিবহনের মালিক, কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠে।যাত্রীদের অভিযোগ, ভাড়া- সিট নিয়ে প্রায়ই হেলপার- কন্ডাক্টররা ধাক্কাধাক্কি, চিৎকার- চেঁচামেচি এমনকি নারী যাত্রীদের সঙ্গেও অশোভন আচরণ করে থাকে। একাধিক স্ট্যান্ডে হেলপারদের যাত্রী টানাহেঁচড়ার দৃশ্যও নিয়মিত ঘটনা।২০২২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ‘তাকওয়া’ পরিবহনকে শহরের যানজটের অন্যতম মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে এটি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়। নিষিদ্ধ ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার পাশাপাশি তাকওয়া পরিবহনের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ ছিল।ভ্রাম্যমাণ আদালতের একাধিক অভিযানে ২০২২ সালে তাকওয়া পরিবহনের বিরুদ্ধে ৬৫টি মামলা, ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা জরিমানা এবং ২৭টি গাড়ি ডাম্পিং করা হয়। লাইসেন্স না থাকায় জেল দেওয়া হয় ২৭ চালককে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরই আবার একই বাস- স্টাফ আগের মতো রাস্তায় নেমে পড়ে।ঘটনা অস্বীকার করে গাজীপুর জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন (অব.) মোশাররফ হোসেন বলেন, রাস্তার মধ্যে আমাদের তিনটি চেকপোস্ট আছে। যারা নিয়ম ভঙ্গ করে গাড়ি চালায় তাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। I Don’t Know About কেউ যদি অভিযোগ করে তাহলে ব্যবস্থা নিবো।ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে গাজীপুর জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের দায়িত্বরত মো. হোসেন বলেন, ‘আমরা নানা রকম উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে বাস মালিক পক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে সঠিক ভাবে পরিচালনা করবে। আগে আমাদের সুলতান ভাই ছিলেন সবকিছু সুশৃঙ্খলতার মধ্যে ছিলো।’এ বিষয়ে গাজীপুর হাইওয়ে রিজিয়ন এর পুলিশ সুপার (এসপি) মো. রহমতুল্লাহ বলেন, আমি নতুন জয়েন্ট করেছি, তাছাড়া মেট্রোপলিটন এলাকা থেকে গাড়ি ছাড়ে এটা মেট্রোপলিটন ট্রাফিকের দেখার কথা। এবং মহাসড়কে বাস আটকিয়ে চেক করতে আমাদের অসুবিধা হয়। কেউ যদি আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয় তাহলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’বিআরটিএ গাজীপুর সার্কেল এর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এস এম মাহফুজুর রহমান জানান, গাজীপুরের যতো পরিবহন মালিক- শ্রমিক সংগঠন আছে তাদের অনুরোধ করা হয়েছে, যাতে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি না চালাতে। মাঠ পর্যায়ে তদারকি আরও জোরদার করা হবে।অবৈধ পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, শিশু শ্রম বন্ধ, যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ফিটনেসবিহীন বাস অপসারণ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিতা, এসব দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।গাজীপুর বাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে মহাসড়ক ও নগরীতে তাকওয়া পরিবহন সহ অন্যন্য যানবাহনের বিশৃঙ্খলা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান স্থানীয়রা।ইখা

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
সিআইডির ওপর হামলার ঘটনায় মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার
সিআইডির ওপর হামলার ঘটনায় মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

যশোরে সিআইডি টিমের ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনায় এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (০৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে কোতোয়ালি Read more

বাংলাদেশ জাপানি ভাষা শিক্ষক সমিতি নতুন কার্যনির্বাহী ঘোষণা
বাংলাদেশ জাপানি ভাষা শিক্ষক সমিতি নতুন কার্যনির্বাহী ঘোষণা

বাংলাদেশ জাপানি ভাষা শিক্ষক সমিতি (জালটাব) ২০২৫-২৬ কার্যবর্ষের নতুন কার্যনির্বাহীর কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে সভাপতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক Read more

নাটোরে পানি প্রবাহ বন্ধ, নির্বিচারে চলছে পোনা মাছ নিধনের মহোৎসব
নাটোরে পানি প্রবাহ বন্ধ, নির্বিচারে চলছে পোনা মাছ নিধনের মহোৎসব

প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে নাটোরের হালতিবিলসহ বিভিন্ন বিলে মাছের পোনা নিধনের মহোৎসব চলছে। এই অঞ্চলের নদ-নদী ও খাল-বিলের পানিতে রাত-দিন প্রকাশ্যে Read more

খুনিকে জীবিত গ্রেফতার চাই, বন্দুকযুদ্ধের নাটক চাই না: ইনকিলাব মঞ্চ
খুনিকে জীবিত গ্রেফতার চাই, বন্দুকযুদ্ধের নাটক চাই না: ইনকিলাব মঞ্চ

শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চ বলেছে, খুনিকে দ্রুত জীবিত গ্রেফতার চাই, বন্দুকযুদ্ধের কোনো নাটক দেখতে চাই না।রোববার (২১ Read more

শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে
শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে

আন্দোলনরত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে এ অর্থ দুই ধাপে Read more

‘কমপ্লিট শাটডাউন’ চলবে, ঘোষণা বিএসসি প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের
‘কমপ্লিট শাটডাউন’ চলবে, ঘোষণা বিএসসি প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের

সরকারি-বেসরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান ‘কমপ্লিট শাটডাউন অব ইঞ্জিনিয়ার্স’ চলমান রাখার ঘোষণা দিয়েছেন প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের নেতারা। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন