আজ ১০ নভেম্বর, ‘হিসাববিজ্ঞান দিবস। সারা বিশ্বে সকল ধরনের ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে হিসাববিদদের বর্ণাঢ্য অবদানের কথা স্মরণ করে তাঁদের সম্মানার্থে এ দিবসটি উদ্যাপিত হয়।১০ নভেম্বরের নির্দিষ্ট তারিখটি বেছে নেয়ার মূল কারণ হচ্ছে এই দিনেই ১৪৯৪ খ্রীষ্টাব্দে ‘Summa de Arithmetica, Geometria, Proportioni et Proportionalita’-নামে ইটালীর ভেনিসে একটি বই প্রকাশিত হয়-যার বাংলা করলে অর্থ দাাঁড়ায়, ”পাটিগণিত, জ্যামিতি ও অনুপাত সম্পর্কিত সামগ্রিক ধারনা” (“Everything About Arithmetic, Geometry and Proportion”)। এটি মূলত: দুই তরফা দাখিলা পদ্ধতি (double entry book keeping)- এর উপর প্রথম বই -যা ভবিষ্যত হিসাববিদদের জন্য ছিল একটি মাইলফলক। এর উপর ভিত্তি করেই সারা বিশ্বে বর্তমান হিসাববিজ্ঞান পরিচালিত হচ্ছে। আমরা অনেকেই জানি বইটির লেখক আর কেউ নন। তিনি হচ্ছেন ইটালীয় বংশদ্ভূত গণিতবিদ লুকা বার্তোলোমিও ডি প্যাসিওলি (Luca Bartolomeo de Pacioli), যাকে আমরা সবাই ছোটবেলা থেকেই সংক্ষেপে ’লুকা প্যাসিওলি’ হিসাবে জানি। তিনিই প্রথম জাবেদা (journal entry ও খতিয়ানের (ledger))-এর ব্যবহারসহ হিসাববিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারনার সূত্রপাত করেন। লুকা প্যাসিলিও ছিলেন লিওনার্দো দ্যা-ভিঞ্চি-এর গণিত-এর শিক্ষক। অনেকের মতে লিউনার্দো দ্যা-ভিঞ্চি, লুকা প্যাসিলিও-এর একজন অতি ঘনিষ্ঠ সহযোগীও ছিলেন। ১৪৪৭ সালে ইটালীর সানসিপলক্রো-তে তাঁর জন্ম, যিনি ১৫১৭ সালে পৃথিবী থেকে আমাদের ছেড়ে চলে যান।লুকা প্যাসিওলি তাঁর ”পাটিগণিত, জ্যামিতি ও অনুপাত সম্পর্কিত সামগ্রিক ধারনা” বইটির প্রথম দুই অংশে পাটিগনিত ও জ্যামিতি নিয়ে আলোচনা করেন। বইটির তৃতীয় অংশে মোট ৩৬টি অধ্যায়ে হিসাবরক্ষণের উপর আলোচনা করেন ও বিভিন্ন সূত্রের অবতারনা করেন, যা ১৫০৪ খ্রীষ্টাব্দে পূণঃমুদ্রিত হয়। বইটির একটি অধ্যায়ের নাম ’ডি কম্পিউটিস অব স্ক্রিপটুরিস” (De Computis of Scripturis) যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ’গণনা ও লিখা’। এতে তিনি দুই-তরফা দাখিলা পদ্ধতির বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং দ্বিতীয় অংশে বিন্যাস সংক্রান্ত (Disposition) বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেন বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। উল্লেখ্য, তার এই বইটির জন্য তিনি ইটালীর ভ্যানিস শহরে একজন ধর্মযাজক হিসাবেও পরিচিতি লাভ করেন। মূলত ’হিসাব’ ও ’বিজ্ঞান’-এ দুটি শব্দের মিলিত রূপই হচ্ছে ”হিসাব বিজ্ঞান”। আভিধানিকভাবে ’হিসাব’ বলতে গণণা করাকে বুঝায়। আর বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে ’হিসাব’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ”অর্থ বা অর্থের মাপকাঠিতে পরিমাপযোগ্য কোন কার্য্যরে আদান-প্রদান সম্পর্কিত ঘটনার বিবরনী।” আর ’বিজ্ঞান’ বলতে ”কোন বিষয় সম্পর্কে সুশৃংখল জ্ঞানকে বুঝানো হয়ে থাকে।” তাই সার্বিক অর্থে, ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সুশৃংঙ্খলভাবে লেনদেনের সংরক্ষন, ফলাফল নির্ণয় ও বিশ্লেষন করার নামই হচ্ছে ’হিসাববিজ্ঞান’। অতি প্রাচীনকাল হতেই ভিন্ন আংগিকে হিসাববিজ্ঞানের প্রচলন হয়ে আসছিল, যা ছিল সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। প্রস্তর যুগে মানুষ যখন বনে জংগলে, পাহাড়-পর্বত, গুহায় বাস করত এবং জীবিকার জন্য ফল-মূল ও পশু-পাখি শিকার করত, তখন তারা গাছের গায়ে বা গুহার গায়ে দাগ বা চিহ্ন দিয়ে বা দড়িতে গিঁট দিয়ে দৈনন্দিন শিকারের হিসাব লিখে রাখত। অনেকের মতে, প্রায় ৭০০০ বছর পূর্বে মেসোপটেমিয়া নদীর তীরে যে সভ্যতা গড়ে উঠে সেখানেও আদিম পদ্ধতিতে কৃষি উৎপাদনের হিসাব রাখা হত। সেই হিসাবের মূল উপাদান ছিল বছরওয়ারী ফসল উৎপাদনের তুলনা করা আর মোট ফসলের কে কত অংশ মন্দিরে দান করত তার হিসাব রাখা। আর এই অবৈজ্ঞানিক হিসাবটি রাখা হত দেয়ালে চিহ্ন দেয়ার মাধ্যমে। এই প্রাচীন দেওয়াল লিখন গুলোকে অনেকেই হিসাববিজ্ঞানের প্রাচীন প্রচেষ্টা বলে মনে করেন। হিসাববিজ্ঞানের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করে, ৪০০০ হাজার বছরের পুরাতন ইতিহাসকে হিসাববিজ্ঞানের সূচনাকাল হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। আর ১৩৪০ সালে হিসাববিজ্ঞানের যে যাত্রা শুরু হয় ইটালীর ভ্যানিস শহরে-তারই পূর্ণাংগ রূপ পায় ১৪৯৪ সালে- লুকা প্যাসিওলি-র দুই-তরফা দাখিলা পদ্ধতির মাধ্যমে। তাঁর সূত্র ও ব্যাখ্যার উপরই দাঁড়িয়ে আছে আজকের আধুনিক হিসাববিজ্ঞান।বিশেষজ্ঞের অভিমত, ১৯৭২ সালে সানডিয়াগো-তে তরুনদেরকে হিসাববিজ্ঞান-কে পেশা হিসাবে নেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদানের জন্য পৃথিবীতে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ’হিসাববিজ্ঞান দিবস’ অনাঢ়রম্বড়ভাবে পালিত হয়। এতে ব্যক্তিগত পর্যায়সহ সরকারী-বেসরকারী অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা ও সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য হিসাববিজ্ঞানের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। বিশ্বজুড়ে সব পেশার মানুষ তখন থেকেই এই নির্দিষ্ট দিবসে হিসাবদিদেরকে বিভিন্নভাবে সম্মাননা প্রদান করে থাকেন। সহকর্মীরা এই দিনে তাদের প্রতিষ্ঠানের হিসববিদদেরকে বিভিন্নভাবে প্রশংসা করে থাকেন। বিশেষ কর্মদক্ষতার জন্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধান কর্তৃক তাদেরকে পুরষ্কৃত করা হয় এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সকল হিসাববিজ্ঞান কর্মীদের ’ধন্যবাদ নোট’ (‘Thank-You Note’) প্রদান করা হয়।এইচএ
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
