নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের এক প্রান্তে, আদি ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে, প্রায় দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে এক অনন্য গ্রামীণ ঐতিহ্য—কাইকারটেক হাট। সময়ের বিবর্তন, শিল্পায়নের চাপ আর আধুনিকতার ঢেউয়ের মাঝেও হাটটি এখনো গ্রামীণ জীবন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে প্রাণসঞ্চার করে আসছে।প্রতি রোববার ভোর থেকেই জমে ওঠে কাইকারটেকের ঐতিহ্যবাহী এই হাট। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই দূর-দূরান্তের ক্রেতা-বিক্রেতারা নৌকা, ভ্যান, ট্রাক কিংবা পায়ে হেঁটে এসে পসরা সাজিয়ে বসেন। শাকসবজি, মাছ-মাংস, গরু-ছাগল, কাঠ-বাঁশ, কৃষিজ পণ্য—সব মিলিয়ে পুরো হাট তখন হয়ে ওঠে এক জীবন্ত গ্রামীণ চিত্রকর্ম।সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, হাটে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই পাওয়া যায়। খাবারদাবার, ঘর বানানোর সরঞ্জাম, কৃষিকাজের উপকরণ, দেশি মাছ, মসলা, হাঁস-মুরগি, কবুতর—এ যেন গ্রামের মানুষের নির্ভরতার এক বিশাল বাজার। পাশাপাশি পাওয়া যায় হাল-জোয়াল, মই, বেলচা, জালের সুতা, বাঁশ-কাঠ, কলমের গাছ, বনায়নের চারা, মাটির হাঁড়ি-পাতিল, রশি, চাটাই, হাতপাখা, সুপারি, গুড়, শুকনো মাছ, আলু-পেঁয়াজ-রসুনসহ গৃহস্থালির নানান উপকরণ।এছাড়াও লুঙ্গি-শাড়ি, গামছা, জুতা-স্যান্ডেল, স্কুলব্যাগ, খাতা-কলম, বই, ব্যাটারি, টর্চলাইট, ঘড়ি, প্রসাধনী, শিশুদের খেলনা, টব, ফুলের গাছ থেকে শুরু করে ছোট গৃহসজ্জার জিনিসপত্র পর্যন্ত সবই মেলে এই হাটে।প্রবীণদের মতে, একসময় কাইকারটেক হাটে হাতি-ঘোড়ারও বেচাকেনা হতো। রাজা-বাদশার আমলে এ হাটের ছিল বিশেষ কদর। হাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি শতবর্ষী কড়ই ও হিজল গাছ আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। আগে সাপের খেলা, বানরের নাচ ও বিভিন্ন লোকজ বিনোদনের আয়োজন হাটকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলত।হাটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিখ্যাত ‘পুতা মিষ্টি’র ঐতিহ্যও। দেখতে শিলপোতার মতো এই মিষ্টির ওজন এক থেকে দুই কেজি পর্যন্ত হয়। রোববার এলে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ শুধু এই মিষ্টি কিনতে আসে। এর দাম প্রতি কেজি ২০০–২৫০ টাকা। মিষ্টি ব্যবসায়ী রাজীব ঘোষ বলেন, “দাদার আমল থেকে আমরা এই মিষ্টি বানাচ্ছি। এটা ব্যবসা নয়, আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।”বর্ষা এলেই কাইকারটেকে জমে ওঠে নৌকার হাট। কোষা, ডিঙ্গি, মাছ ধরার নৌকা—সবই এখানে পাওয়া যায়। আশেপাশের গজারিয়া, মুন্সীগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে ক্রেতারা আসে নৌকা কিনতে। নদের পাড়েই হাট হওয়ায় কেনা নৌকা সরাসরি নদীতে নামিয়ে নেওয়ার সুবিধা রয়েছে।হাটে দেখা যায় হাসেম মিয়ার ঝালমুড়ি থেকে শুরু করে বুট, চানাচুর, পিঁয়াজু, আখের গুড়ের শরবতের স্টল। ৮১ বছর বয়সী শরবত বিক্রেতা মজিবুর রহমান বলেন, “পাকিস্তান আমল থেকে শরবত বিক্রি করি। কাইকারটেক হাট ছাড়া জীবনের কথা ভাবতেই পারি না।”তরুণ ক্রেতা রাসেল মিয়া বলেন, “দাদার মুখে শুনেছি, হাটের বয়স প্রায় ২০০ বছর। এখনো এ জায়গার বাতাসে পুরোনো দিনের গন্ধ পাই।”কাইকারটেক শুধু একটি হাট নয়, এটি এক প্রাচীন অর্থনৈতিক কেন্দ্র। আশপাশের কয়েকটি জেলার কৃষক ও বণিকরা এখান থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। পাইকারি দামে পণ্য বিক্রি হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি সক্রিয় থাকে। নৌকা ব্যবসা, কৃষিজ পণ্য ও মিষ্টি—সব মিলিয়ে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ধারাবাহিক স্পন্দন জুগিয়ে যাচ্ছে।তবে সময়ের সঙ্গে হাটের পরিসর কিছুটা কমে এসেছে। নদীভাঙন, পুরোনো গাছ কেটে ফেলা এবং আধুনিক বাজারের প্রসারের কারণে আগের জৌলুস হারাচ্ছে কাইকারটেক হাট। স্থানীয়দের দাবি, ঐতিহাসিক এ হাটকে ‘ঐতিহ্যবাহী হাট’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হোক—যাতে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন হয়ে টিকে থাকে।ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে শতবর্ষী বটগাছের ছায়ায় যখন রোববারের ভোরে কাইকারটেক হাটের কোলাহল শুরু হয়, তখন মনে হয়—এ শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মানুষের জীবনের এক অনন্ত গল্প।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
