চারপাশে প্রতিবেশী আর স্বজনদের ভিড়। বিলাপ-সান্ত্বনা কোনো কিছুই ছুঁয়ে যাচ্ছে না শোকাহত মা মরিয়ম বেগমকে। তিনি একেবারে নির্বাক। চোখে পানি নেই। বসতঘরের সামনে মাটিতে বসে শুধু ফ্যালফ্যাল চোখে এদিক-ওদিক তাকান। কিছুক্ষণ পরপর মূর্চা যাচ্ছিলেন। সবাই সান্ত্বনা দেওয়ার বৃথা চেষ্টায়। কিন্তু কিছুতেই মনকে বুঝাতে পারছেন না তার একমাত্র ছেলে ‘আমির হামজা’ আর নেই।বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) বিকালে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার শুকুরহাটা গ্রামের একটি বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এমন হৃদয় বিদারক আর মর্মান্তিক দৃশ্য। গত মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মাদ্রাসার পাশের একটি ডোবা থেকে উদ্ধার হয় সায়েমউদ্দিন বিশ্বাস ও মরিয়ম বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলের বস্তাবন্দি অর্ধগলিত মরদেহ।কৃষিকাজ করা বাবা সায়েমউদ্দিন বিশ্বাস তিনটি মেয়ের পর পাওয়া একমাত্র ছেলেকে বড় আলেম বানানোর স্বপ্ন দেখতেন। তাই তিন বছর আগে চান্দড়া তা’লিমুল কুরআন মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলেন তাকে। কিন্তু মাত্র পঞ্চাশ টাকার তুচ্ছ বিরোধে সেই স্বপ্ন এক নির্মম আঘাতে গুঁড়িয়ে গেছে। শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে পুরো গ্রাম, অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছে সবাই।নিহত আমির হামজার বাবা সায়েমউদ্দিন বিশ্বাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার তিনটি মেয়ের পর এই একটাই ছেলে—আমার ‘আমির হামজা’। পরম যত্নে কোলে-পিঠে মানুষ করলাম। মাসুম বাচ্চাকে এমন নৃশংসভাবে কেন হত্যা করলো? আমার আলেম বানানোর স্বপ্নটা তছনছ হয়ে গেল!”মা মরিয়ম বেগমের শেষ দেখা হয়েছিল গত বৃহস্পতিবার বিকালে। সেদিন বাড়িতে এসেছিল সে। তবে সামনে পরীক্ষার জন্য পড়ালেখার চাপ থাকায় ওইদিন সন্ধ্যায়ই মাদ্রাসায় ফিরে গিয়েছিল ছেলে। শনিবার বিকালে মাদ্রাসার ফোন থেকে তার সঙ্গেই হয়েছিল শেষ কথা। সন্তানহারা মায়ের একটাই আর্তনাদ—“আমার ছেলেকে যারা এমন করে মারলো, তাদের কি বিচার হবে না?”আলফাডাঙ্গা থানা সূত্রে জানা যায়, গত রোববার (১৯ অক্টোবর) বিকালে চান্দড়া তা’লিমুল কুরআন মাদ্রাসা থেকে নিখোঁজ হয় আমির হামজা। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মাদ্রাসার পার্শ্ববর্তী একটি ডোবায় বস্তাবন্দী অবস্থায় তার অর্ধগলিত লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। লাশ ডুবিয়ে রাখার জন্য বস্তার ভেতর ইটও ভরা ছিল।দ্রুত তদন্তে নেমে পুলিশ মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করে এবং ঘাতককে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়া কিশোরটি হলো আমির হামজারই সহপাঠী, ১৬ বছরের ফরহাদ রেজা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফরহাদ রেজা স্বীকার করেছে, নিহত আমির হামজা তার কাছে ৫০ টাকা পাওনা ছিল। ঘটনার দিন পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে তাকে গালিগালাজ করায় ফরহাদ প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। সে কৌশলে হামজাকে মাদ্রাসার পাশের একটি বাগানে নিয়ে যায়। সেখানে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সে আমির হামজার গলা টিপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর অপরাধ ঢাকতে নিজের বাড়ি থেকে বস্তা ও ইট এনে মরদেহটি ডোবার পানিতে ফেলে দেয়। ফরহাদ একাই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে স্বীকার করেছে সে।ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (মধুখালী সার্কেল) মো. আজম খান বলেন, “এটি একটি ক্লুলেস হত্যাকাণ্ড ছিল। কাঁথা ও সাইকেলের সূত্র ধরে এ হত্যার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কিশোরটি হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তবে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”আলফাডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শাহজালাল আলম জানান, “নিহতের বাবা সায়েমউদ্দিন বিশ্বাস বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। গ্রেপ্তারকৃত কিশোরকে বৃহস্পতিবার আদালতে পাঠানো হয়েছে।”এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
