পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে কমিউনিটি ক্লিনিকের জমি নিয়ে পারস্পারিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে লঙ্কা কাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। জমি সংক্রান্ত একের পর এক বিরোধে আদালতে অন্তত সাতটি মামলা হয়েছে। সর্বশেষ একই জমিতে সরকারি স্বার্থ রক্ষায় বাধা প্রদানে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছেন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক।উপজেলার দেবীডুবা ইউনিয়নের দারারহাট কমিউনিটি ক্লিনিকের জমি নিয়ে ২০১৮ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত একাধিকবার মামলা করেছেন ক্লিনিকের দাতা সদস্য মোহাম্মদ আলী। সম্প্রতি ১৩ অক্টোবর ক্লিনিকের জমিতে স্থাপনা নির্মাণে বাধা প্রদান করতে গেলে দেবীডুবা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক জাকির হোসেনকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ উঠে। এই ঘটনায় ওই রাতেই জাকির হোসেন বাদী হয়ে দেবীগঞ্জ থানায় আটজনের নামসহ অজ্ঞাত ১০-১১ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন। ওই ক্লিনিকের সিএইচসিপি দীপক রায়ও পৃথক অভিযোগ দাখিল করেন।মোহাম্মদ আলীর পরিবার, অন্যান্য দাতা সদস্য ও স্থানীয়দের সাথে এই বিষয়ে কথা হয় প্রতিবেদকের। জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পাঁচজন ব্যক্তির দেওয়া ২০ শতক জমিতে গড়ে উঠে দারারহাট কমিউনিটি ক্লিনিক। ক্লিনিককে ঘিরে গড়ে উঠে দারারহাট বাজার।জমি দাতাদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ আলী, অনীল চন্দ্র রায়, সুনীল চন্দ্র রায়, অনিত্য কুমার রায় এবং নূর ইসলাম। এদের প্রত্যেকে চার শতক করে জমি প্রদান করেন ক্লিনিকে। এর মধ্যে মোহাম্মদ আলী ক্রয় সূত্রে প্রাপ্ত জমি থেকে এবং বাকীরা পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত জমি থেকে জমি দেন। ক্লিনিক ভবন নির্মাণ ও ক্লিনিকের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে সেবা কার্যক্রম। ২০১৮ সালে প্রথমবার ঘটে বিপত্তি। ওই সময় মোহাম্মদ আলী ক্লিনিকের সামনে থাকা মাঠের ৮ শতক জমি নিজের দাবি করে সেখানে গাছ রোপণ করতে যান। পরে অন্যান্য দাতা সদস্য ও স্থানীয়রা এতে বাধা দেন। এরপর মোহাম্মদ আলী আদালতে মামলা করেন। ২০১৮ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ক্লিনিকের জমি কেন্দ্রিক আদালতে সাতটি মামলা করেন মোহাম্মদ আলী। মামলাগুলোতে আসামী করা হয় বিভিন্ন সময় ক্লিনিকের জমি দখলে বাধা দিতে আসা স্থানীয় ও ক্লিনিক কমিটির সদস্যদের। শুধু স্থানীয়দের নয়, ওই ক্লিনিকে কর্মরত সিএইচসিপি দীপক রায়কেও একবার আসামী করা হয়।স্থানীয় আবু হানিফ বলেন, মোহাম্মদ আলীর একের পর এক মামলায় জর্জরিত ক্লিনিক কমিটির সদস্যবৃন্দসহ একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি। দীর্ঘ দিন থেকে তারা মামলা মোকাবিলা করতে গিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এরপরও ক্লিনিকের জমি রক্ষায় পিছপা হননি।ওই এলাকার ষাটোর্ধ রাজেন্দ্র বর্মন ও শষধর বর্মন ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের জমি রক্ষায় উপজেলা কিংবা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বরাবরই উদাসীন। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ক্লিনিকের জমি রক্ষায় কোন আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলীর আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এর প্রেক্ষিতে গত ১৩ অক্টোবর দেওয়াল নির্মাণ কাজ শুরু করেন মোহাম্মদ আলী। দুর্গা পূজায় একবার দেওয়াল নির্মাণের চেষ্টা করা হলে ইউপি চেয়ারম্যান এসে কাজ বন্ধ করে দেন।ঘটনার রাতে (১৩ অক্টোবর) মোহাম্মদ আলীর ছেলে সুলতান মাহমুদ জানান, ক্লিনিক এলাকায় আমার বাবার ১৩ শতক জমি আছে। এর মধ্যে ৪ শতক জমি ক্লিনিকে দেওয়া হয়েছিল। বাকী ৯ শতক জমি বাজারে দেওয়া হয়েছিল অন্য জায়গায় আমাদের এওয়াজ বদল দেওয়া হবে এই শর্তে। কিন্তু আমাদের সেই ৯ শতক জমি বুঝিয়ে না দেওয়ায় আমরা বাধ্য হয়ে আদালতে শরণাপন্ন হয়েছি।তিনি বলেন, সেদিন (১৩ অক্টোবর) দেওয়াল নির্মাণের সময় ভূমি অফিসের লোকজন এসে আমাদের কাজে বাধা দেন। শুধু কাজে বাধা নয়, আমাদের লোকজনকে চড় থাপ্পড় দেন জাকির।যদিও সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাজারের কোন অংশ নয় বরং ক্লিনিকের মাঠ দখলে নিতে দেওয়াল নির্মাণ করা হচ্ছিল। সেখানে এখনো ইট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।দাতা সদস্য নূর ইসলামের ছেলে বেলাল হোসেন বলেন, মোহাম্মদ আলী আদালত থেকে যে অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা এনেছিলেন তার প্রেক্ষিতে ক্লিনিক কমিটির পক্ষ থেকে আপিল করা হয়। আমরা আদেশের কপি পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বললেও ১৩ অক্টোবর মোহাম্মদ আলী লোকজন এনে দেওয়াল নির্মাণ শুরু করেন। পরে দেখা যায়, ১২ অক্টোবর আদালত সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে দেন।স্থানীয়রা বলেন, ঘটনার দিন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক জাকির কাউকে মারধর করেননি। একা একজন কিভাবে এতজনের মাঝে মারধর করবেন। তারা জানান, দাতা সদস্য অনিত্যের ঠাকুরদা-বাবা-কাকাদের নিকট থেকে মোহাম্মদ আলী বিভিন্ন সময় দারারহাট মৌজায় সাড়ে ৮৪ শতক জমি ক্রয় করেছিলেন। এই পুরো জমি তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল কেনার সময়ই। কিন্তু হুট করে ২০১৮ সালে ক্লিনিকের সামনে আট শতক জমি নিজের বলে দাবি করেন মোহাম্মদ আলী।স্থানীয়রা আরো জানান, মোহাম্মদ আলীর ক্রয়কৃত কিছু জমি নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়। কৌশলে সেই জমি এখন ক্লিনিক এলাকায় দাবি করছেন তিনি। ক্লিনিকের আশপাশের জমির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি বারবার ক্লিনিক কমিটির সদস্যদের নামে মামলা দিয়েছেন।দেবীডুবা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ ভূমি সহকারী কর্মকর্তা দিপালী রানী বলেন, দুর্গা পূজা চলাকালীন মোহাম্মদ আলী গং স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলে সে সময় কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুনরায় তারা ১৩ অক্টোবর নির্মাণ কাজ শুরু করলে ইউএনও স্যারের নির্দেশে আমরা বাধা প্রদান করতে যাই। কিন্তু ঘটনাস্থলে যাওয়ার পরই ওই পক্ষের লোকজন আমাদের দিকে তেড়ে আসে। আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে। পরে জাকির ভাই প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর করা হয়।এইদিকে মামলা পর থেকে পলাতক মোহাম্মদ আলীর পুরো পরিবার। শনিবার সরেজমিন মোহাম্মদ আলীর বাড়ি গিয়ে বাড়ির মূল গেটে তালা দেখা যায়।মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও দেবীগঞ্জ থানার এসআই রবিউল ইসলাম বলেন, আসামীদের গ্রেফতারে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুমন ধর বলেন, ২০১৮ সাল থেকে কমিউনিটি ক্লিনিকের জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। আমি যোগদানের পর বিষয়টি ইউএনও মহোদয়কে জানাই। উনি আশ্বস্ত করেছিলেন ব্যাপারটি উনি দেখবেন এবং উনি এটি নিশ্চিতও করেছেন। বিষয়টি এখন মীমাংসিত।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
