বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে বাবুগঞ্জ উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন। শান্ত, নিস্তব্ধ এই গ্রামেই জন্মেছিলেন বাংলাদেশের এক গৌরবোজ্জ্বল সন্তান- বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। একসময় গ্রামের প্রতিটি পথ, প্রতিটি বাতাস তাঁর স্মৃতিতে ভরপুর ছিল। দীর্ঘ সময়ের অবহেলা ও অযত্নে সেই স্মৃতি ক্রমে মলিন হয়ে গিয়েছিল। অবহেলার ধ্বংসচ্ছায়ায় জরাজীর্ণ হয়ে উঠেছিল তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি।এছাড়া ২০০৮ সালে বরিশাল জেলা পরিষদের অর্থায়নে নির্মিত গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরও হারিয়েছিল প্রাণ। একসময় পাঠক ও দর্শনার্থীর আনাগোনা থাকলেও কয়েক বছর ধরে তালাবদ্ধ থাকার কারণে এখন বিদ্যুৎ নেই, পরিচর্যা নেই, এমনকি পানির ব্যবস্থাও অনুপস্থিত।তবে এবার নতুন করে আশার আলো দেখছেন স্থানীয়রা। অবশেষে সরকারি নজরে এসেছে বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটি। গত বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মো. রায়হান কাওছার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর সংস্কারের নির্দেশ দেন।এর পরপরই উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় সংস্কার অভিযান। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারুক আহমেদের নেতৃত্বে শনিবার (১৮ অক্টোবর) সকাল থেকে ভিআইপি গেস্টরুম, লাইব্রেরি ও ওয়াশরুম সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি চলছে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগও। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বসতঘর ও এর আশপাশের এলাকা।সরেজমিনে দেখা গেছে, জাদুঘরটির চারপাশ জঙ্গলে ঢেকে ছিল। দীর্ঘদিনের অবহেলায় ভবনের চারদিকে গজিয়ে উঠেছিল ঝোপঝাড়, ছাদেও জন্ম নিয়েছিল গাছগাছালি। এখন কর্মীরা গাছপালা কেটে জঙ্গল পরিষ্কার করছেন, ছাদ থেকেও সরানো হচ্ছে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা। কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো ভবনটি পাবে নতুন রংতুলি, নতুন রূপ।জেলা পরিষদের উদ্যোগে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন ও ভবন সংস্কারের কাজও শুরু হচ্ছে শিগগিরই। উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যাশা, অচিরেই পুরো এলাকাটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।জানা গেছে, ২০০৮ সালে প্রায় ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে একসময় কর্মরত ছিলেন একজন তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী লাইব্রেরিয়ান। কিন্তু ২০২২ সালে তাঁর মৃত্যুর পর নতুন কাউকে নিয়োগ না দেওয়ায় এটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দর্শনার্থীহীন, আলোহীন হয়ে পড়ে স্থানটি।এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারুক আহমেদ সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, দীর্ঘদিন কেউ যত্ন না নেওয়ায় বাড়ি ও জাদুঘর পরিত্যক্ত ছিল। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এগুলো সংস্কার করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। মানুষ যাতে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে জানতে ও চিনতে পারে, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।তিনি আরও জানান, বাড়ি, লাইব্রেরি, ভিআইপি রুম ও ওয়াশরুম সংস্কারের খরচ উপজেলা প্রশাসন বহন করছে, আর ভবন সংস্কার ও কেয়ারটেকার নিয়োগের দায়িত্ব জেলা পরিষদের।উল্লেখ্য, ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ বাবুগঞ্জ উপজেলার রহিমগঞ্জ গ্রামে জন্ম নেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। বরিশাল বিএম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে যোগ দেন মুজিব বাহিনীতে। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা নদীর তীরে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন এই বীর সেনানী।দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা সেই সন্তানকে স্মরণে রাখতে বাবুগঞ্জের রহিমগঞ্জ গ্রাম আজ ‘জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন’। এখানকার মানুষের প্রত্যাশা- সঠিক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের স্মৃতি যেন আবারও জীবন্ত হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণের এক স্থায়ী ঠিকানা।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
