আবুধাবিতে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশকে ধবলধোলাই করেছে আফগানিস্তান। প্রথম দুই ম্যাচে বাজে পারফরম্যান্সে হারের পর সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল মেহেদী হাসান মিরাজের দলের। তবে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং সব বিভাগে হতাশ করে লজ্জ্বার ষোলোকলা পূর্ণ করেছে তারা।মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) আবুধাবিতে আফগানিস্তানের দেওয়া ২৯৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ৯৩ রানে অল আউট হয়েছে বাংলাদেশ। ২০০ রানের ব্যবধানে এই হারে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ হারার হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়ে মেহেদী হাসান মিরাজের দল।আবুধাবিতে প্রথমে ব্যাট করে আফগানিস্তান ২৯৩ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করায়। দলের পক্ষে ইব্রাহিম জাদরান দুর্দান্ত ব্যাটিং করে ৯৫ রান করেন। তবে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন মোহাম্মদ নবী। শেষদিকে তার ব্যাট থেকে আসে মাত্র ৩৭ বলে ৬২ রানের অপরাজিত টর্নেডো ইনিংস।২৯৪ রানের এই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডার ভেঙে পড়ে তাসের ঘরের মতো। ওপেনার সাইফ হাসান ছাড়া আর কোনো ব্যাটারই ছুঁতে পারেননি দুই অঙ্কের ঘরে। বাংলাদেশের ব্যাটারদের স্কোর বোর্ডের দিকে তাকালে মনে হয় এটি কোনো মোবাইল নম্বর!১৯৯৭ সালের ১৫ জুন বাংলাদেশকে ওয়ানডে স্টেটাস দেয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত বলতে গেলে বড় কোনো অর্জন নেই বাংলাদেশের। অন্যদিকে ২০১৭ সালে আইসিসির পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে আফগানিস্তান। এখন পর্যন্ত বড় কোনো ট্রফি জিততে না পারলেও বিশ্ব ক্রিকেটে ঠিকই নিজেদের আগমনী বার্তা দিয়ে ফেলেছে যুদ্ধ বিধ্বস্ত এই দেশটি।বাংলাদেশের এমন পারফরম্যান্সে ক্ষোভে ফুঁসছেন ভক্ত-সমর্থকরা। তারা প্রশ্ন তুলছেন, বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা এই দলটির সামর্থ্য নিয়ে।বাংলাদেশ সবশেষ কোনো ওয়ানডে সিরিজ জিতেছিল ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। ঘরের মাঠে ঐ সিরিজে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে সিরিজটি জিতেছিল বাংলাদেশ। এরপর ঘরে-বাইরে মিলিয়ে বাংলাদেশ খেলেছে আরও চারটি ওয়ানডে সিরিজ। এছাড়া এসময়ের মধ্যে দলটি অংশগ্রহণ করেছে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে।হতাশার কথা হলো, গত প্রায় দেড় বছরে খেলা চারটি সিরিজের মধ্যে ১টিও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। এর মধ্যে আবার দুই সিরিজেই হয়েছে হোয়াইটওয়াশ। আর সবশেষ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে কোনো ম্যাচে জয়ের সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারেনি টাইগারা। টুর্নামেন্টজুড়ে মাত্র ১ পয়েন্ট সংগ্রহ করতে পেরেছে তারা। তাও আবার বৃষ্টির কল্যাণে।যদিও প্রায় প্রতিটি সিরিজ বা আইসিসি ট্রফিতে ভরাডুবির পর দলের অধিনায়ক কিংবা সংশ্লিষ্টদের ভবিষ্যতে উন্নতি করার বুলি আওড়ান। আর তাদের এসব মন্তব্যের পর নেটিজেনরা মজার ছলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে ‘আইসিসি’র শিক্ষানবিশ’ দল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করেন!এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে, আর কত বছর বা কতটি সিরিজ কিংবা টুর্নামেন্ট খেললে বাংলাদেশের এই ‘শিক্ষানবিশকাল’ শেষ হবে? কিংবা বাংলাদেশ ক্রিকেটের এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সমাধানই বা কী?সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইসিসির পূর্ণ সদস্য হওয়ার এত বছর পরেও বাংলাদেশের ক্রিকেটে উল্লেখযোগ্য সফলতা না আসার কারণ হচ্ছে ‘খেলোয়াড়দের মানসিকতা’। চাপের মুখে প্রায়ই তাদের ছন্দ হারাতে দেখা যায়। সবশেষ এশিয়া কাপের দিকে তাকালেই এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়।এশিয়া কাপের সুপার ফোরে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। এর পরের ম্যাচে শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি তারা। ফলে দেখতে হয়েছে হার। তবে তখনও ফাইনালে যাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়নি। সুপার ফোরের শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল মাত্র ১৩৬ রান। দুবাইয়ের ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে এই নিতান্তই সহজ একটি ব্যাপার।তবে বাংলাদেশ এই সহজ ব্যাপারটি নিয়েছে কঠিনভাবে। ফলে দেখতে হয়েছে হার। ব্যাটারদের দায়িত্বজ্ঞানহীন শট নির্বাচন, টপ অর্ডারের ব্যর্থতা এবং মিডল অর্ডারের দুর্বলতার কারণে ১১ রানে হেরে এশিয়া কাপ থেকে ছিটকে গেছিল বাংলাদেশ।এছাড়া বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে পরিশ্রম করার তেমন প্রবণতা দেখা যায় না। এই কারণে কোনো ক্রিকেটার একবার দল থেকে ছিটকে পড়লে খুব কম সময়ই সে দলে আবার ফিরতে সক্ষম হয়।এর পাশাপাশি বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোকেও দুষছেন কেউ কেউ। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক মঞ্চে উন্নতি করতে হলে ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নতির বিকল্প নেই। কেননা, এটিই দলের ‘পাইপলাইন’ মজবুত করে। তাদের দাবি, ঘরোয়া ক্রিকেটে ব্যর্থতার কারণেই বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমানের ক্রিকেটার উঠে আসে না।এদিকে দেশের ক্রিকেট থেকে একপ্রকার নির্বাসনে আছেন সাবেক বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। এছাড়াও মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবালরাও বিদায় বলে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে। কিন্তু তাদের পরবর্তী ক্রিকেটারদের মধ্যে তেমন ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে কয়েকজন ক্রিকেটার নজরকাড়া পারফরম্যান্স করলেও সেই ধারা অব্যাহত রাখতে তারা ব্যর্থ হন।ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তরুণ ক্রিকেটার তুলে আনতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এছাড়া দল বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও তারা সেভাবে মুন্সিয়ানা দেখাতে পারছেন না। এসব কারণেই বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা ভালো পারফর্ম করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।এদিকে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ হারের পর দলের এমন ব্যর্থতা মেনে নিয়েছেন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এই সিরিজে আমরা ভালো খেলতে পারিনি, এটা আমরা সবাই স্বীকার করে নিচ্ছি। কিছু সুযোগ এসেছিল, কিন্তু কাজে লাগাতে পারিনি। বোলিংয়ে কিছু ইতিবাচক দিক ছিল, সেগুলোকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছি।’তার এমন মন্তব্যের পর আবারও একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ‘শিক্ষানবিশকাল’ শেষ হবে কবে?আরডি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
