দক্ষিণ চট্টগ্রামের ব্যস্ততম বাণিজ্যকেন্দ্র সাতকানিয়ার কেরানীহাট। এই হাট ঘিরে প্রতিদিন চলে কোটি টাকার লেনদেন, আসা–যাওয়ায় ব্যস্ত থাকে হাজারো মানুষ ও শত শত যানবাহন। কিন্তু ব এই জনবহুল এলাকাটি ফুটপাত ও সড়ক দখলের কারণে পরিণত হয়েছে জনদুর্ভোগে। প্রশাসন একের পর এক উচ্ছেদ অভিযান চালালেও দৃশ্যপট বদলায় না। দফায় দফায় অভিযান হয়, দোকান ভাঙা হয়, যানবাহন সরানো হয়—কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর আবারও সব আগের মতো!সর্বশেষ গত ১৮ জুন টানা পাঁচ ঘণ্টা চলে যৌথ উচ্ছেদ অভিযান। এতে অংশ নেয় উপজেলা প্রশাসন, সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগ, হাইওয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। অভিযানে সওজের জায়গা ও ফুটপাত দখল করে গড়ে তোলা শতাধিক দোকানপাট, চায়ের স্টল ও শেড ভেঙে দেওয়া হয়।তৎকালীন সাতকানিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফারিস্তা করিম অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তখন তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কেরানীহাটকে যানজটমুক্ত করতে এই উচ্ছেদ প্রয়োজন ছিল। কেউ যেন আর সরকারি জায়গা দখল না করে সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এরপর কিছুটা স্বস্তি দেখা যায় স্থানীয় মানুষদের মধ্যে। তবে সে স্বস্তি বেশিদিন টেকেনি। জুনের শেষ দিকে আবারও দেখা গেল, রাস্তার ধারে টিনের চাল টাঙানো হচ্ছে, দোকানের কাঠামো দাঁড় করানো হচ্ছে, ফুটপাতের জায়গায় রাখা হচ্ছে ট্রাক–ডাম্পার।কেরানীহাট বাজারের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘উচ্ছেদের পর দুই সপ্তাহ দোকান বন্ধ রেখেছিলাম। পরে আবার বসেছি। দোকান না দিলে সংসার চলে না।’আরেকজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘ট্রাক–ডাম্পার রাখার জায়গা নেই। সওজের জায়গা ফাঁকা দেখে মালিকরা গাড়ি রাখে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে এমনটাই চলবে।’ এমন পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কেরানীহাট এলাকায় মাইকিং করে উপজেলা প্রশাসন ঘোষণা দেয়—উচ্ছেদের পর নতুন করে স্থাপিত সব অবৈধ দোকান ও স্থাপনা নিজ উদ্যোগে সাত দিনের মধ্যে সরিয়ে ফেলতে হবে। অন্যথায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এরপর ওইদিন রাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাঁর অফিসিয়াল ফেসবুক আইডিতে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘কেরানীহাটের যানজট: একপক্ষের অবৈধভাবে স্থাপিত দোকান/স্থাপনা উচ্ছেদ করার কিছুদিন পর অন্য একপক্ষ নতুন করে অবৈধভাবেই দোকানপাট/স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করে। অকেজো, নষ্ট ট্রাক–ডাম্পারের উপর নোটিশ সাঁটানোর পর সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হলেও সেখানে জায়গা দখল করে নেয় অন্য মালিকদের বাস–ট্রাক–ডাম্পার।’ইউএনও আরও লিখেছেন, ‘জনগণের চাওয়া উপজেলা প্রশাসন প্রতিনিয়ত যানজট নিরসনের কাজ করুক। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সাতকানিয়াবাসী নিজেরা না চাইলে, পরিবহন মালিকদের ভাবোদয় না হলে এই সমস্যার সমাধান করা দুরূহ। যানজট নিরসনে আইনের প্রয়োগের চেয়ে সদিচ্ছা থাকা জরুরি।’স্থানীয় বাসিন্দা জহির আহমদ বলেন, উচ্ছেদের সময় আমরা স্বস্তি পাই, কিন্তু তা বেশিদিন থাকে না। দোকানদাররা রাতারাতি আবার বসে। প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে, না হলে কেরানীহাট কখনো স্বস্তি পাবে না।তবে কিছু দোকানদার ভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন। তাদের ভাষায়, জীবিকার প্রশ্নে তারা বাধ্য হয়ে আবার দোকান স্থাপন করেছেন। একজন বলেন, আমাদের কেউ জায়গা দেয় না। এখানে বসলে দিনে এক হাজার টাকার ব্যবসা হয়। উচ্ছেদ হলে ক্ষতি আমাদেরই।দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার বলা হয় কেরানীহাটকে। এই হাট দিয়ে কক্সবাজার, লোহাগাড়া, বান্দরবান ও চট্টগ্রাম শহরগামী প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু সওজের জায়গা ও ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় মূল সড়কটি এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন সকাল, দুপুর, বিকেল কিংবা রাতে কেরানীহাট এলাকা হয়ে যায় যানজটের জাল। ছোট-বড় যানবাহন আটকে পড়ে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে যাত্রীরা।স্থানীয় বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, কেরানীহাট মোড় থেকে রেলক্রসিং এলাকা পর্যন্ত মাত্র দুই কিলোমিটার পথ যেতে এখন আধা ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার উপায় নেই, রাস্তাও সংকীর্ণ। কখনো কখনো অ্যাম্বুলেন্সও আটকে যায়।অভিযোগ রয়েছে, কেরানীহাটের পুনর্দখলের পেছনে রয়েছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী মহল। তারা সওজের জায়গা “ভাড়া” দিয়ে দেয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে। একজন দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা মাসে ৩–৪ হাজার টাকা দিই জায়গা ভাড়ার নামে। কে নেয় সেটা বললে বিপদে পড়ব।একটি সূত্র জানায়, এই দখল থেকে প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা হাতবদল হয়। ফলে প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চক্রটি আবার সক্রিয় হয়।একজন সমাজকর্মী বলেন, ‘কেরানীহাটে দখল এখন শুধু জায়গার নয়, এটি অর্থনীতি ও রাজনীতির অংশ। এ চক্রকে আইনের আওতায় না আনলে যতবার উচ্ছেদ করবেন, ততবারই তারা ফিরে আসবে।’অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘প্রশাসন তাদের সমস্যার দিকটা বিবেচনা করছে না। চায়ের দোকানি তুষার বলেন, আমরা জানি জায়গাটা সরকারি, কিন্তু যদি বসতে না দেই তাহলে পরিবার চলবে কেমন করে? সরকারি জায়গা দখল ভালো না, কিন্তু বিকল্পও নেই।’সওজ আইন অনুযায়ী, মহাসড়কের দুই পাশে নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে কোনো স্থাপনা বা দোকান স্থাপন করা নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এই আইন প্রযোজ্য নয় বললেই চলে। স্থানীয় প্রভাব, রাজনৈতিক আশ্রয়–প্রশ্রয় এবং ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে এসব দখল অব্যাহত থাকে।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘কেরানীহাটের যানজট প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি এখন সামাজিক অভ্যাসের অংশ হয়ে গেছে। জনগণ নিজেরা সচেতন না হলে যতবার উচ্ছেদ করব, ততবারই দখল হবে।’তিনি আরও বলেন, ‘আইনের প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। সমাজে যদি সচেতনতা ও সদিচ্ছা না থাকে, তাহলে সরকারি জায়গা রক্ষা করা কঠিন।’আরডি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
