নড়াইল-মাগুরা সড়কের দুর্গাপুর এলাকার রেলব্রীজের নিচে বিছানো একখানা মাদুর। তার ওপর সাজানো কয়েক প্যাকেট বিস্কুট, চানাচুর, বাদাম, কলা, সিগারেট আর শিশুদের জন্য কিছু চিপস। ছোট্ট সেই দোকানটি ঘিরেই চলছে মফিজ উদ্দিনের জীবনসংগ্রাম। জন্ম থেকেই তার দুই পা বিকল। এক হাতে চারটি আঙুল, অন্য হাতে মাত্র দুটি। চলাচলের ভরসা একটি প্যাডেল চালিত হুইলচেয়ার। এমন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েই কেটেছে জীবনের দীর্ঘ ষাট বছর। তবুও দুঃখ নিয়ে বসে না থেকে নিজের শ্রমেই সংসার চালিয়েছেন মফিজ উদ্দিন।নড়াইল জেলা শহরের দুর্গাপুর গ্রামে শৈশব কেটেছে মফিজ উদ্দিনের। বাবা নাজিম উদ্দীন। সংসারে তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি একজন। শারীরিক সীমাবদ্ধতা শুধু তার নয়, পরিবারে আরও কয়েকজন ভাইবোনও একই সমস্যায় ভুগেছেন। তবুও ভিক্ষা নয়, জীবন কাটছে শ্রম-ঘামে।চলতি পথের ক্রেতারা কখনো থেমে এক-আধটা পণ্য কিনে চলে যান। আবার দোকান ফাঁকাই পড়ে থাকে অনেকক্ষণ।কথা হয় মফিজ উদ্দিনের সাথে,‘প্রায় পঁচিশ বছর ধরে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সামনে একটি মুদি দোকান চালিয়েছেন তিনি। সেখানে বেচাকেনা ভালোই হত। দোকানঘরটি ভেঙে যায়। টাকার অভাবে আর নতুন করে দোকান তুলতে পারেননি। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর রেলব্রীজের নিচে মাদুর পেতে আবার দোকান বসান। প্রতিদিনের আয়-রোজগার খুব বেশি হয় না। বেচা-কেনা ভালো হলে দিনে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মতো লাভ থাকে। এ দিয়ে চলছে ঘরভাড়া, সংসারের খরচ, নিজের ওষুধ আর একমাত্র ছোট মেয়ের পড়াশোনা। নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে মেয়েটি। অন্য দুই মেয়ে কে বিয়ে দিয়েছি। বহু বছর আগেই মারা গেছেন স্ত্রী।মফিজ আরও বলেন, ‘বেশি কিছু চাই না। যদি একটা দোকানঘর তুলতে পারতাম, পুঁজির জোগান হলে মালামাল উঠাতে পারতাম তাহলে আরেকটু ভালোভাবে চলতে পারতাম। কিন্তু যেভাবেই হোক, আল্লাহর ইচ্ছায় আমি ভালো আছি।,মফিজের এই সংগ্রামী জীবনের কথা এলাকার মানুষও জানেন। দুর্গাপুরের বাসিন্দা কাজী আরাফাত, ইমন সিকদার, পথচারী জাহিদুল ইসলাম ও ইজিবাইক চালক হাবিবুর রহমান বলেন, প্রতিবন্ধকতা নিয়েও এত পরিশ্রম করে বেঁচে থাকা সত্যিই দৃষ্টান্ত। বিত্তবান মানুষ কিংবা সরকার যদি তাকে দোকানঘর ও পুঁজি দিয়ে সহায়তা করে, তাহলে তার আত্মমর্যাদা অটুট রেখে বাকি জীবনটা নিশ্চিন্তে কাটাতে পারবেন।মফিজের বন্ধু লুৎফার মোল্যা প্রায়ই দোকানে এসে তাকে সাহায্য করেন। তিনি বলেন,‘মফিজ আমার এলাকার ভাই-বন্ধু। ছোটবেলা থেকেই ও খেটে খায়। আয় হলে খায়, না হলে না খায়। কিন্তু কারও দুয়ারে গিয়ে হাত পাতেনি।,নড়াইল সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সুজা উদ্দীন জানান, ‘মফিজ উদ্দিনকে ইতোমধ্যেই একটি প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি সুযোগ-সুবিধা যেমন সুদমুক্ত ঋণ বা অন্য যেকোনো সহায়তার আওতায়ও তাকে আনার চেষ্টা চলছে।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
