জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বড়তারা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) তালিকায় প্রভাব বিস্তার করে নিজের আত্মীয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও নিজ আত্মীয়দের বাইরে প্রায় প্রতিটি সুবিধাভোগী মহিলার কাছ থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে ঐ ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে।জানা গেছে, ভিডব্লিউবি (পূর্বের নাম ভিজিডি) কর্মসূচির আওতায় নিজের স্ত্রীর নামসহ একাধিক আত্মীয়ের নাম তালিকাভুক্ত করেন তিনি। অন্যান্য সুবিধাভোগী মহিলার কাছ থেকেও আদায় করেছেন ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এমনকি ভিডব্লিউবি চুড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত হলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের সাথে যোগসাজস করে ইউনিয়নের প্রতিটি সুবিধাভোগীর কাছ থেকে ১ শত টাকা করে প্রায় ৪৪ হাজার টাকা আদায় করেন।উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ভিডব্লিউবি কর্মসূচির আওতায় অসহায় দুস্থ নারীদের প্রতি মাসে বিনা মূল্যে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। কর্মসূচিতে অনলাইনে আবেদন চাওয়া হয়। এরপর ইউপি চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ট্যাগ অফিসার ও ইউপি সদস্যসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সরেজমিন যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয়। উপজেলার বড়তারা ইউনিয়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভিডব্লিউবি কর্মসূচির আওতায় ইউনিয়নের প্রায় ১৮শত জন নারী আবেদন করেন। যাচাই-বাছাই শেষে ৪৪০ জনকে চূড়ান্ত করে যাচাই-বাছাই কমিটি। চলতি বছরের ৩০ জুন ভিডব্লিউবি নারী বাছাই কমিটির সভাপতি হিসেবে ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম, সদস্যসচিব হিসেবে ইউনিয়নের সচিব, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ও সর্বশেষ ইউএনও সই করে পুরো ইউনিয়নের ৪৪০ জনের চূড়ান্ত তালিকা তৈরী করেন। এর মধ্যে ৫ নং ওয়ার্ডে উপকারভোগী রয়েছেন ৫৩ জন। তবে এই ওয়ার্ডের তালিকায় প্রকৃত দুস্থ নারীদের বাদ দিয়ে নিজের স্ত্রী ও আত্মীয়দের নাম তালিকাভুক্ত করেন ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলামে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের মধ্যে অধিকাংশই দুস্থ নন। কারও কারও আবার ৬-৮ বিঘা জমি, পাকা বাড়ি, একাধিক পুকুর, একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।তালিকা ঘেটে দেখা যায়, অভিযুক্ত ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলামের ভাবি, চাচি, মামি, খালাসহ ৮ জন আত্মীয়ের নাম রয়েছে, যাদের অধিকাংশই সাবলম্বী। তালিকার ২১২ নং মাফুজা খাতুন ও ২৩০ নং সেলিনা খাতুন, এই দু’জন ইউপি সদস্য শফিকুলের আপন বড় ভাইয়ের দুই স্ত্রী, ২১০ নং মোছাঃ খোতেজা সম্পর্কে তার মামি, ২১৪ নং রিমা বেগম, ২১৬ নং আলেয়া বেগম ও ২১৭ নং আমেনা বেগম তার চাচি এবং ১৮২ নং শেফালী বেগম সম্পর্কে তার খালা। বাকি ৪৬ জন মহিলার কাছ থেকেও বিভিন্ন জনের মাধ্যমে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়েছে বলেও অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।এ বিষয়ে বাঘাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর নুর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শফিকুল মেম্বার একজন দুর্নীতিবাজ লোক। গরীব মানুষজনকে এসব সরকারি সুযোগ সুবিধা না দিয়ে নিজের আত্মীয় স্বজনকে দিচ্ছে। সে টাকা ছাড়া কারও কোনো কাজ করে দেয় না। এমনকি টাকা খেয়ে তিনি ওয়ারিশান থেকেও স্বজনের নাম বাদ দেয়। আমরা তার বিচার চাই।’নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপকারভোগী বলেন, ‘আমার কার্ড করে দেওয়ার জন্য আমার কাছে তিন হাজার টাকা চায়। না দিতে চাইলে তিনি বলেন, তুমি না দিলে আর একজন দিবে, তাকে করে দিবো। পরে চাল দেওয়ার দিন দেখি সব তারই আত্মীয় স্বজন। আবার বড়লোকদেরও কার্ড করে দিয়েছে।’মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক কর্মচারী বলেন, ‘প্রতিবার চাল দেওয়ার দিন বড়তারা ইউনিয়ন পরিষদে চাল ক্রয়ের অভিযোগ আছে। পরে স্যার আমাদের ব্যবস্থা নিতে পাঠালে আমাদের দেখে চাল ক্রেতারা পালিয়ে যায়। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শফিকুল মেম্বারের বড় ভাই শাহিনুর ইসলাম তার ভাইয়ের ক্ষমতা দেখিয়ে প্রকাশ্যে পরিষদের সামনে চাল ক্রয় করে।’অভিযোগের ব্যাপারে জানার জন্য বড়তারা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের মোবাইল ফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর নিজস্বভাবে তদন্ত করে তালিকা করেছে। এবারে আমাদের কোনো হাত নেই।’জানতে চাইলে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা লায়লা নাসরিন জাহান বলেন, ‘অভিযুক্ত ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম ট্যাগ অফিসারদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে তার কয়েকজন স্বাবলস্বী আত্মীয়সহ এক ডাক্তার ভাগনীর নামও অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ আসলে আমরা চুড়ান্ত তালিকায় সেসব নাম বাদ দিয়েছি। সম্ভবত সেখানে তাঁর স্ত্রীর নামও ছিলো। পরে তাকে এ বিষয়ে ভর্ৎসনা করেছি। এরপরও যেসব উপকারভোগী সচ্ছল ও সম্পদশালী হয়েও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসিফ আল জিনাত বলেন, ‘নীতিমালা অনুযায়ী তালিকা করা হয়েছে। কোথাও এর ব্যত্যয় হয়ে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’এসএম
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
