‘ভাবিনি আর কোনোদিন চোখে আলো দেখব। কিন্তু বিধাতা যেন রহমত হিসেবে পাঠালেন সোহেল ক্ষ্যাপাকে। তাঁর অর্থায়নে আমার চোখের দুটি অপারেশন হয়েছে। এখন আবার পৃথিবীটা দেখতে পারি।’ কান্নাভেজা চোখে এভাবেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিলেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার শিয়ালকোল গুচ্ছগ্রামের ৬৫ বছর বয়সী জামেলা বেগম। স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলেকে নিয়ে ঠাঁই হয় তার এই গুচ্ছগ্রামে।জামেলা বেগমের মতো অসংখ্য অসহায় মানুষের ভরসার নাম এখন সোহেল ক্ষ্যাপা। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার পরিচিত এই মানবসেবী ঘুরে বেড়ান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে; কারও চিকিৎসার খরচ, কারও খাদ্যসামগ্রী, আবার কারও শীতবস্ত্র নিয়ে হাজির হন দুয়ারে দুয়ারে। তাঁর একমাত্র পরিচয় তিনি মানবতার জন্য বেঁচে আছেন।স্থানীয়রা জানান, একসময় সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন সোহেল ক্ষ্যাপা। শৃঙ্খলাপূর্ণ সেই চাকরি ছেড়ে তিনি মনোনিবেশ করেন লালনচর্চায়। প্রয়াত লালনকন্যা ফরিদা পারভিনের কাছ থেকে সঙ্গীতের তালিম নেন। গুরু-শিষ্যের সেই সম্পর্ক আজও তাকে অনুপ্রাণিত করে। লালনের দর্শন ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ তাঁর জীবনের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।লালনের গান গেয়ে তিনি শুধু দর্শনকেই ছড়িয়ে দেননি, বরং সেই দর্শনকে বাস্তবে প্রয়োগ করেছেন। মানুষের সেবাই তার কাছে এখন বড় সাধনা। নিজের সামর্থ্যের ভেতর যা পারেন, তাই নিয়েই এগিয়ে যান সাহায্যের প্রয়োজনে থাকা মানুষের কাছে।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভূঞাপুর উপজেলার চরনিকলা গ্রামে অভিরাম-শ্যামলীদাস দম্পতি দীর্ঘদিন একটি বাঁশঝাড়ে পলিথিন দিয়ে মোড়ানো ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করে আসছিলেন। মানবতার ফেরিওয়ালা সোহেল ক্ষ্যাপা খবর পেয়ে ছুটে যান সেখানে। অসুস্থ শ্যামলীদাসকে দেখে দুকরে কেদে উঠে তার মন। অভিরাম দাসকে নগদ ২০ হাজার টাকা সহায়তা করেন। সেই টাকা দিয়ে প্রতিদিন বাজারে মাছের ব্যবসা করে স্ত্রী শ্যামলী দাসের ওষুধ ও খাবার নিয়ে যান অভিরাম দাস।একই এলাকার তাওহিদ নামের এক ৭ বছরের শিশুকে রেখে মা চলে যান ভিন্ন কোনো সংসারে। বাবাও বাধেন নতুন সংসার। সে সংসারে ঠাই হয়নি শিশু তাওহীদের। সেই তাওহীদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেন সোহেল ক্ষ্যাপা। স্থানীয় একটি মাদরাসায় পড়াশোনা করে শিশু তাওহীদ। তার দাদীকে কিনে দিয়েছেন এক জোড়া খাসি ছাগল। যেন তাওহীদের প্রয়োজনে অন্য কোথাও হাত বাড়াতে না হয়।উপজেলার বামনহাটা গ্রামের ৭০ বছর বয়সী সোনা মিঞা। জীবনের ২৫ বছর তিনি আশ্রিত ছিলেন অন্যের বাড়িতে। শেষ বয়সে এসে বাড়ির মালিকের মৃত্যুর পর সেখানে আর ঠাই মেলেনি। বাধ্য হয়ে ঐ এলাকার নদীর ধারে একটি ব্রীজের পাটাতনের নিচে বাসা বেঁধেছেন। যেমনটা পাখিরা বাঁধে। অনাহারে অর্ধাহারে স্ত্রীকে নিয়ে কোনরকম দিন পার করছেন সোনা মিঞা। তার দূর্দশায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সোহেল ক্ষ্যাপা। দু বেলা দু মুঠো খাবার যোগাতে তাকে উপহার দিয়েছেন একটি ব্যাটারি চালিত ভ্যান। সোনা মিঞা এখন অন্তত না খেয়ে থাকবে না, এমন প্রত্যাশা মানবসেবী সোহেল ক্ষ্যাপার।উত্তরের জেলা কুড়িগ্রাম থেকে শুরু করে নিজ এলাকায় এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক পরিবারকে তিনি দিয়েছেন সহায়তা। কারও চিকিৎসার জন্য টাকা তুলে দেন হাতে, কারও ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেন অন্ধকার সময়ে। শীতে নিঃস্ব মানুষদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন। অনেক সময় একাই, আবার অনেক সময় তার উদ্যোগে স্থানীয় তরুণদেরও যুক্ত করেন এসব মানবিক কর্মকাণ্ডে।তার এসব কর্মকাণ্ডে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষ মুগ্ধ। স্থানীয় শিক্ষক জসিম উদ্দীন বলেন, সোহেল ক্ষ্যাপা মানেই মানবতার সৈনিক। মানুষের ভালোবাসাই তার প্রেরণা। তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে খবর পেয়ে ছুটে যান সেই দূর দূরান্তে। তার একটি ফেসবুক পেইজ, ‘মানবতার সেবায় সোহেল’। মূলত সেখান থেকেই তিনি এসব অসহায় মানুষদের সন্ধান পান। মানবসেবায় তার যে অদম্য ইচ্ছা সেটা দেখে তরুণেরা অনুপ্রাণিত হবে।সোহেল ক্ষ্যাপা বলেন, মানুষের জন্য কিছু করতে পারলেই আমি শান্তি পাই। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করছি। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল মানুষের সেবা করার। ২০২২ সাল থেকে আমি একটি ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে কাজ শুরু করি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়েছি। সেখানকার মানুষের দুঃখ-দূর্দশার চিত্র দেখেছি। সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়েছি।জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, অসহায় মানুষের কান্না কতটা ভারী, তাদের আকুতিগুলো আমি তুলে ধরি। সেগুলো দেখে যারা বিদেশ থেকে বা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাদের দেয়া অর্থ আমি সেই নির্দিষ্ট লোকটির হাতে তুলে দিই। ‘মানবতার সেবায় সোহেল’ এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো, প্রতিবন্ধী ও এতিম শিশুদের পড়াশোনা করা এবং দারিদ্র বিমোচনে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা।ভূঞাপুর থেকে শুরু হওয়া সোহেল ক্ষ্যাপার এই মানবিক কর্মযজ্ঞ এখন অনেকের জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন সত্যিকারের মানবসেবার জন্য কোনো পদ-পদবী নয়, বরং আন্তরিকতা আর ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
