টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে সরকারি ভিডব্লিউবি (ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট) কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের সঞ্চয়ের অন্তত পৌনে ২ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা না রেখে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ফলদা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আবু সাইদ স্বপনের বিরুদ্ধে। টানা তিন মাস ধরে এ অনিয়ম চললেও বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর খবর রাখেনি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অংশ হিসেবে দরিদ্র নারীদের জন্য মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে ভিডব্লিউবি কার্ডধারীরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে টানা দুই বছর ধরে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল পান। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক উপকারভোগীকে নিজেদের নামে ১০ টাকায় ব্যাংক বা এনজিওতে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। চাল উত্তোলনের আগে নির্ধারিত ২২০ টাকা সেই অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে ব্যাংক রসিদ দেখাতে হয়। জমা রাখা অর্থ ২৪ মাস পর্যন্ত ব্যাংকে আমানত হিসেবে থাকে, এবং নির্ধারিত সময়ে উপকারভোগীরা তা উত্তোলন করতে পারেন।কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফলদা ইউনিয়নের ২৮৬ জন কার্ডধারীর কারো অ্যাকাউন্টই খোলা হয়নি। বরং প্রতি মাসে চালের সঙ্গে প্যানেল চেয়ারম্যান আবু সাইদ স্বপনের নির্দেশে জনপ্রতি ২২০ টাকা সংগ্রহ করছেন গ্রাম পুলিশরা। এভাবে তিন দফায় অন্তত ১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ভাতাভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে।সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) তৃতীয়বারের মতো চাল বিতরণের সময় গ্রাম পুলিশের সহায়তায় ২৮৬ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ২২০ টাকা করে মোট ৬২ হাজার ৯২০ টাকা সংগ্রহ করা হয়। উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরকে ম্যানেজ করে এই অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর অনিয়ম ঢাকতে ইউনিয়ন পরিষদের কোনো কর্মচারীর নামে অ্যাকাউন্ট খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সরকারি নিয়মের পরিপন্থী।নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভুক্তভোগী জানান, প্রতিমাসে ২২০ টাকা করে গ্রাম পুলিশকে দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চাল উত্তোলন করতে হয়। এই টাকা কোথায় যায়, জানতে চাইলে একেকজন নানা কথা বলেন। পরে তারা জানতে পারেন, টাকা নাকি ব্যাংকে জমা দেওয়ার কথা। তাঁদের অভিযোগ, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর নিয়মিত তদারকি করলে এ অনিয়ম সম্ভব হতো না।ফলদা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. হযরত আলী বলেন, ‘চিঠি দিয়ে বলা হয়েছিল ভাতাভোগীদের নামে অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে চাল নেওয়ার আগে টাকা জমা রাখতে হবে। কিন্তু যতদূর জানি, কোনো অ্যাকাউন্ট খোলা হয়নি।’ এসব টাকা এখন কোথায় জানতে চাইলে কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বলেন, ‘যারা উঠাচ্ছে তাদের কাছেই। চেয়ারম্যান ও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা কী করছেন সেটা আমি জানি না।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফলদা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আবু সাইদ স্বপন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী অ্যাকাউন্ট খুলে স্লিপ দেখিয়েই চাল দেওয়ার কথা। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়নি। বিগত দিনের টাকা আমার কাছেই জমা রয়েছে, অচিরেই ব্যাংকে জমা দেওয়া হবে।’তিনি আরও বলেন, ‘টাকা আপাতত স্থায়ী কর্মচারীদের অ্যাকাউন্টে রাখা হবে।’ তবে এটি নিয়মবহিভূত কিনা জানতে চাইলে স্বীকার করে বলেন, ‘হ্যাঁ, নিয়ম অনুযায়ী ভাতাভোগীদের নামেই অ্যাকাউন্ট থাকা উচিত। তারপরও আমি আরেকটু খোঁজ নিয়ে দেখি।’ এ বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আমিনা খাতুন বলেন, তফসিলি ব্যাংকে টাকা রাখার কথা। কেন রাখা হয়নি জানি না। কাল আমি জেনে তারপর জানাব।ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. রাজিব হোসেন সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। আপনার মাধ্যমে জানতে পেরে খোঁজ নিয়ে সত্যতা পেয়েছি। কেন ভাতাভোগীদের অ্যাকাউন্ট না খুলে তাদের টাকা নিজের কাছে রাখা হয়েছে, তা চেয়ারম্যানকে কৈফিয়ত তলব করা হবে।উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৭ আগস্ট ফলদা ইউনিয়ন পরিষদের সাতজন সদস্য প্যানেল চেয়ারম্যান আবু সাইদ স্বপনের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। সেখানে প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আবু সাইদ স্বপন নিয়মিত মিটিং বা রেজুলেশন ছাড়াই সরকারি বরাদ্দ, উন্নয়ন প্রকল্প, ভিজিডি-ভিজিএফ কার্ড ও টিআর-কাবিখা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।ওই সময় ইউপি সদস্যরা জনস্বার্থে তাঁকে অপসারণের দাবি জানান। তবে অভিযোগের দুই মাস পার হওয়া সত্ত্বেও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত বা কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ইউপি সদস্যরা উদ্বিগ্ন। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসনিক উদাসীনতার সুযোগে স্বপন আরও অবাধে এসব অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
