প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পার হতে চললেও ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাড়ছে নিরাপত্তার সংকট। ভাঙা সীমানা প্রাচীর, অপ্রতুল নিরাপত্তাকর্মী এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার সুযোগে ক্যাম্পাসটি যেন বহিরাগতদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাহীনতার চিত্রটি সম্প্রতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে কয়েকটি ঘটনায়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সীমানা প্রাচীরের ভাঙা অংশ সংস্কার করলেও সেদিন রাতেই দুষ্কৃতিকারীরা তা আবার ভেঙে ফেলে। এর কিছুদিন আগেই, ক্যাম্পাসে কাজ করতে আসা এক নির্মাণ শ্রমিক মো. আমজাদ হামলার শিকার হন। রাত ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গেটের কাছে দুজন অজ্ঞাত ব্যক্তি তাকে ধরে নতুন কলা ভবনের ভাঙা দেয়ালের আড়ালে নিয়ে মারধর করে তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়।শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই নাজুক যে বহিরাগতরা, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর, অবাধে প্রবেশ করে। বিভিন্ন স্থানে মাদক সেবন থেকে শুরু করে আবাসিক হলের ভেতরেও তাদের বিচরণের অভিযোগ রয়েছে। এই সুযোগে আবাসিক হলগুলোতে মোবাইল, ল্যাপটপ, সাইকেলের মতো ব্যক্তিগত জিনিসপত্র চুরির ঘটনা ঘটছে অহরহ। এমনকি হলের শৌচাগার থেকে পানির ট্যাপ বা বৈদ্যুতিক বাল্ব চুরির মতো ঘটনাও নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।বিদ্রোহী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আল মামুন বলেন, ‘হলে প্রায়ই চুরির ঘটনা ঘটছে এবং বহিরাগতদের চলাচল দেখা যায়। অথচ দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীদের অনেককে মোবাইল ফোনে টিকটক দেখতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।’শুধু চুরি বা ছিনতাই নয়, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের বেপরোয়া বাইক শোডাউন এবং নারী শিক্ষার্থীদের ইভটিজিংয়ের শিকার হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে এক নবীন শিক্ষার্থীকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবির মতো গুরুতর অপরাধও সংঘটিত হয়েছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫৭ একর ক্যাম্পাসের দুটি প্রধান ফটক, চারটি আবাসিক হল, ৪টি একাডেমিক ভবন, ২টি প্রশাসনিক ভবন, উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের বাংলোসহ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ডরমিটরি এবং নির্মাণাধীন একাধিক ভবন মিলিয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন মাত্র ৬৪ জন নিরাপত্তাকর্মী। ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে ভাগ হয়ে ৮ ঘণ্টা করে দায়িত্ব পালন করায় প্রতি পোস্টে মাত্র এক থেকে দুজন কর্মী থাকেন। ফলে কোনো বড় দল বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।সহকারী আনসার কমান্ডার মো. উজ্জল মিয়া জানান, ‘এই স্বল্প লোকবল দিয়ে পুরো ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমাদের অন্তত ১০০ জন সদস্য প্রয়োজন। আমরা আরও ৪০ জনের জন্য চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি।’আনসার কমান্ডার সুজানুর রহমান বলেন, ‘অনেক সময় একা দায়িত্বে থাকায় বহিরাগতদের মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার পরিচয় জানতে চাইলে কিছু শিক্ষার্থীও অসহযোগিতা করেন।’এছাড়াও, নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের যোগাযোগের ঘাটতিও একটি বড় সমস্যা। অনেক নিরাপত্তাকর্মীই প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের চেনেন না বা জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য তাদের ফোন নম্বরও রাখেন না।বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. মো. শামসুজ্জামান নিরাপত্তাকর্মীদের অভিজ্ঞতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। আরেক সহকারী প্রক্টর মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জনি বলেন, ‘সীমিত লোকবল দিয়ে ক্যাম্পাস টহল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। আমরা একাধিকবার জনবল বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েও তেমন সাড়া পাইনি। তবুও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’সার্বিক পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জরুরি ভিত্তিতে সীমানা প্রাচীর স্থায়ীভাবে মেরামত, প্রধান ফটকগুলোতে কঠোর নজরদারি, পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা ও আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক নতুন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ না দিলে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
