কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং এখন মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই এখানে প্রকাশ্যে চলছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের বেচা–বিক্রি। মাদক ব্যবসায় অমিল বা লেনদেনে গরমিল হলেই ঘটছে সংঘর্ষ, ছিনতাই, এমনকি হত্যার ঘটনাও। সর্বশেষ এক গণমাধ্যমকর্মীরও একই ঘটনায় মৃত্যু হয়। নতুন–পুরাতন মিলে সক্রিয় হয়েছে একাধিক মাদক কারবারি সিন্ডিকেট।স্থানীয় সূত্র জানায়, এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে কিছু প্রভাবশালী মহল ও অসাধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যোগসাজশে থাকায় মাদক ব্যবসা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের অভ্যন্তরে এবং আশপাশের গ্রামগুলোতেও মাদকের বিস্তার ঘটেছে। এতে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি এলাকায় বেড়ে যাচ্ছে চুরি–ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ।৫ আগস্টের আগে এসব মাদক বেচা–বিক্রির নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী। বর্তমানে পুরো চক্রটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড যুবদল নেতাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তারা বিভিন্ন কৌশলে মাদক পাচারকারীদের কাছ থেকে ইয়াবা হাতিয়ে নিয়ে নিজেদের কাছে মজুদ করে এবং পরে তা বাজারে বিক্রি করেন। এতে একদিকে যেমন এলাকায় মাদকের বিস্তার বাড়ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য।সিন্ডিকেট প্রধান ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি হেলাল উদ্দিন ওরফে ডাম্পার হেলাল এবং সাধারণ সম্পাদক সেলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে এক ইয়াবা কারবারির কাছ থেকে প্রায় ৩ লাখ পিস ইয়াবা ছিনতাই করা হয়। পরে এসব ইয়াবা নিজের বাড়িতে মজুদ রাখেন হেলাল। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়াতে ও নিজেদের দায় কমাতে অল্প কিছু ইয়াবা এবং একজন কারবারিকে উখিয়া থানা পুলিশের হাতে তুলে দেন তারা।সরেজমিন ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৬ সেপ্টেম্বর ভোরে যুবদল নেতা হেলাল উদ্দিন ও সেলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট রোহিঙ্গা এক ইয়াবা পাচারকারীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবার চালান ছিনতাই করে। এ ঘটনায় স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তি সিন্ডিকেটের সঙ্গে মিলে চালানটি নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করেন।পরে তারা পুলিশের সঙ্গে আঁতাত করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। উভয়ে দায় সারতে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা পুলিশকে দেয়। সেখান থেকে ২০ হাজার পিস নিজেরা গায়েব করে এবং ১০ হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে ওই রোহিঙ্গা পাচারকারীকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ টহল টিম।এমন তথ্যের গুঞ্জন উঠলে উখিয়া থানার অফিসার্স ইনচার্জ জিয়াউল হকের সাথে যোগাযোগ করা হয়। এ সময় তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ওই অভিযানে টহল টিমে ছিলেন এসআই সুমন ও এসআই কামাল। এ ব্যাপারে তারা ভালো বলতে পারবেন। থানায় যা আসছে তাই নিয়ে আসামীকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।এসআই কামালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা খবর পাওয়ার পর ওখানে গিয়ে দেখি একজন আসামী ধৃত আর ১০ হাজার পিস ইয়াবা। এসব নিয়ে থানায় চলে আসছি, এর বাইরে আমরা কিছু জানি না। জানলেও সিভিল টিমে ছিল এসআই সুমন, তারা জানতে পারবেন।এসআই সুমনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে নিয়ে বিল থেকে ১০ হাজার ইয়াবাসহ একজন পাচারকারীকে আটক করেছি। ৩০ হাজার নয়, ১০ হাজার ছিল। সাথে যারা ছিল তারা দেখেছে। আমার কাছেও প্রুফ রেখেছি।সভাপতি হেলালের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিয়েও সাড়া মিলেনি।সাধারণ সম্পাদক সেলিম উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ ঘটনায় আমি ছিলাম না। কারা ছিল আমি জানি না।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভোরে নামাজ পড়তে যাওয়া এক মুসল্লি বলেন, নামাজ শেষে ফেরার পথে দেখি যুবদল নেতা হেলাল, সেলিম ও বাবুলসহ কয়েকজন একজনকে ধরে রেখেছে। তাদের কাছে একটি বড় পলিথিনও ছিল। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে ওই ব্যক্তিকে নিয়ে যায়। আমি কাছে যাইনি, তাই ভেতরে কী ছিল জানি না।পরে সকাল যেতে না যেতে একই এলাকায় ইয়াবা উদ্ধারে র্যাব দফায় দফায় অভিযান চালায়। এ অভিযানে যুবদল নেতা হেলালের বাড়ি থেকে প্রায় ৯০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এছাড়া মাদক বিক্রির নগদ ১৬ লাখ ৭১ হাজার টাকা জব্দ করে। এ সময় হেলালের মা ও এক আত্মীয়সহ দুই নারীকে আটক করতে সক্ষম হয় র্যাব।বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার র্যাবের সহকারী পুলিশ সুপার (ল অ্যান্ড মিডিয়া) আ. ম. ফারুখ। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে র্যাব আরো উল্লেখ করেন, এ ঘটনায় হেলাল, সাদ্দাম, মহিউদ্দিনসহ আরো অনেকেই পালাতক রয়েছেন।স্থানীয়রা বলছেন, কুতুপালং এলাকায় দিন দিন মাদক ব্যবসার ভয়াবহতা বাড়ছে। রাজনৈতিক আশ্রয়–প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা এসব চক্রকে দমন না করলে উখিয়াকে মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে বেশি সময় লাগবে না।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
