টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ছাড়লেন জনবান্ধব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু আবদুল্লাহ খান। মাত্র চার মাসের কম সময়ে দায়িত্ব পালন করেও তিনি মানুষের হৃদয়ে অম্লান ছাপ রেখেছেন। মানবিকতা, সততা ও প্রশাসনিক দক্ষতায় দ্রুত পরিচিতি পাওয়া এই কর্মকর্তা গত সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) ভূঞাপুর থেকে বিদায় নেন এবং বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলায় নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেন।বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৩৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. আবু আবদুল্লাহ খান চলতি বছরের ৪ মে ভূঞাপুরে যোগদান করেন। এর আগে তিনি বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। ভূঞাপুরে যোগদানের কিছু দিনের মধ্যেই নিজ গুণে সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি। উপজেলাবাসী একজন সজ্জন, কর্মঠ, জনবান্ধব ও দক্ষ অফিসারকে হারিয়ে আজ বেদনাবিধুর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও তার প্রশংসায় ভেসেছে নানারকম পোস্ট।স্থানীয়রা জানান, ইউএনও আবু আবদুল্লাহ খান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি দাপ্তরিক কক্ষের মধ্যে। তিনি সরেজমিনে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের খোঁজ নিয়েছেন, অসহায় ও দুঃস্থদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এর মধ্যে চরনিকলা গ্রামের অভিরাম দাস দম্পতি কিংবা আগতেরিল্যা গ্রামের শিহাব উদ্দিনকে খাদ্য, অর্থ সহায়তা ও ঘর নির্মাণের আশ্বাস দেওয়ার ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়।দায়িত্ব পালনকালে তিনি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত ঘুরে উন্নয়ন কাজের খোঁজখবর নিতেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমে রেখেছেন সক্রিয় ভূমিকা। উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বের পাশাপাশি পৌর প্রশাসক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। পৌরসভার ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার, খাল খনন, বাসস্ট্যান্ড ও ফুটপাত দখলমুক্তকরণে তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।অস্থায়ী দায়িত্ব পেয়ে ভূমি সেবাকে জনগণের জন্য সহজলভ্য ও দালালমুক্ত করতে তিনি কার্যকর উদ্যোগ নেন। দ্রুত সময়ে ভোগান্তিমুক্ত নামজারি সেবা দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন।এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচির আওতায় তিনি প্রতিবন্ধীদের মাঝে হুইলচেয়ার বিতরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ, অসচ্ছল পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থী ও অসুস্থদের অনুদান প্রদান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সহায়তা এবং প্রায় ৪৮ জন উপকারভোগীর মাঝে ঋণ বিতরণের উদ্যোগ নেন। পাশাপাশি উন্নয়ন খাতে উপজেলার চলাচল অযোগ্য রাস্তাগুলো পাকাকরণে প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করেন তিনি। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও সক্রিয় ভূমিকা রাখেনবিশেষ করে প্রায় এক দশকের তথ্য বিভ্রাট নিরসনে উদ্যোগ নেন ইউএনও আব্দুল্লাহ। জানা যায়, প্রায় এক দশক ধরে ভূঞাপুরের সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ওয়েবসাইটে পুরনো ও বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকায় মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর ইউএনও আবু আবদুল্লাহ খান সমস্যাটি চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ওয়েবসাইট হালনাগাদ করার নির্দেশ দেন। ফলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, থানা, শিক্ষা প্রকৌশলসহ এক ডজনেরও বেশি দপ্তরের ওয়েবসাইট নতুনভাবে সাজানো হয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের নাম মুছে দিয়ে বর্তমান কর্মকর্তাদের তথ্য যুক্ত করা হয়। স্থানীয়রা বলছেন, অল্প সময়ের দায়িত্বকালেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃত জনবান্ধব কর্মকর্তা। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই তাকে সমানভাবে আপনজন মনে করতেন। তার আকস্মিক বিদায়ে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও হতভম্ব হয়ে পড়েন। ফেসবুক পোস্টে তারা কৃতজ্ঞতা ও আবেগ প্রকাশ করেছেন।শিক্ষার্থী খালিদ হাসান বলেন, ভূঞাপুরের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পথ আজ আপনাকে মনে রাখবে। কারণ আপনি শুধু দায়িত্বে ছিলেন না, ছিলেন একজন অভিভাবক। বিদায়ের সুর বেদনাময়, তবুও প্রার্থনা—নতুন কর্মস্থলে যেন গর্ব আর সাফল্যের আলোয় আপনার দিনগুলো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নাজমুল হাসান তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে লেখেন, তার আকস্মিক বদলি আমাদের ব্যথিত করেছে।ভূঞাপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক লেখেন, ভেদরগঞ্জ উপজেলাবাসি সৌভাগ্যবান আপনার মত একজন জনবান্ধব নির্বাহী অফিসার পেল। আপনার প্রতি ভূঞাপুরের সাধারণ মানুষের দোয়া থাকবে সবসময়।শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ কুমার দত্ত বলেন, অনেক ইউএনও আসছেন-গেছেন, কিন্তু তাকে ভুলতে পারব না। তিনি তার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেছেন। যে কোনো সমস্যা নিয়ে গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতেন। আসলে আমরা সত্যিকারের একজন জনবান্ধব ইউএনও হারিয়েছি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে তিনি একটু বেশি নজর দিতেন। বিশেষ করে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কল্যাণ ট্রাস্ট করার পরিকল্পনা করেছিলেন, যেন একটি শিশুও দরিদ্রতার কারণে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়। চার মাসের কম সময় তিনি যা করেছেন সেটা ভূঞাপুরের মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখবে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) উপজেলা শাখার সভাপতি মির্জা মহিউদ্দিন বলেন, নিঃসন্দেহে তিনি ভালো মানুষ ছিলেন। তার সাহসিকতার প্রশংসা করতেই হয়। তিনি অনেক আন্তরিক ছিলেন। কাজ করার প্রখর ইচ্ছে ছিল তার। অল্প সময়েই তিনি পৌরসভা এবং উপজেলা যেভাবে পরিচালনা করতেন আমরা মুগ্ধ হয়েছি। ভূঞাপুরের জন্য দুর্ভাগ্য একজন সৎ এবং ব্রিলিয়ান্ট অফিসার খুব অল্প সময়েই চলে গেলেন। আমি ব্যথিত ও আপ্লুত। প্রত্যাশা থাকবে তার নতুন কর্মস্থলেও তিনি আলোকিত করবেন।উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জামান তালুকদার সেলু বলেন, তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সকল রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। সততার সঙ্গে যতদিন ছিলেন ভূঞাপুরের মানুষের জন্য কাজ করেছেন। আমরা অল্পদিনে তার কাছ থেকে যথেষ্ট সেবা পেয়েছি। তিনি একজন সৎ, নিষ্ঠাবান এবং জনবান্ধব অফিসার ছিলেন। তার জন্য শুভকামনা থাকবে।বিদায়বেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু আবদুল্লাহ খান বলেন, আপনাদের সেবা দিতে এসেছিলাম। কতটুকু দিতে পেরেছি জানি না। তবে আমার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেছি। ইচ্ছে ছিল আপনাদের সঙ্গে নিয়ে সুন্দর একটি উপজেলা উপহার দেব, কিন্তু সরকারি আদেশ আমাকে মানতেই হবে। অল্প সময়ে আপনাদের থেকে আমি যে ভালোবাসা পেয়েছি, সেটাই আমার নতুন কর্মস্থলে অনুপ্রেরণা যোগাবে।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
