চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকায় একটি ছয়তলা ভবন তথ্য গোপন করে রেজিস্ট্রি করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সরকারের প্রায় ৫৪ লাখ ৮১ হাজার ৮৯৬ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার, জমির ক্রেতা ও বিক্রেতার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে করা এক লিখিত অভিযোগে উঠে এসেছে, এই চক্র প্রায় সাত কোটি টাকার সম্পত্তি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সরকারের কোটি টাকার রাজস্ব গোপনে ফাঁকি দিয়েছে।অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জায়গাটির প্রকৃত মূল্য গোপন করে কম দেখানো হয়েছে, যার মাধ্যমে সরকারি ভ্যাট, স্ট্যাম্প ফি, উৎস করসহ নানা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে ঘুষ প্রদানের বিনিময়ে রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।ভবনের রেজিস্ট্রি কবলায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ০৯ ফেব্রুয়ারি ৬২৮ নং বায়নানামা মূলে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকার প্লট নং-১৫ ও একটি ছয়তলা ভবন বিক্রয়ের চুক্তি হয়। সম্পত্তিটির প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ক্রেতা মোহাম্মদ সরোয়ার অগ্রিম ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন এবং অবশিষ্ট ৬ কোটি টাকা বাকি রাখেন। কিন্তু পরে ২০২৩ সালের ২১ জুন, দলিল নং ৩৪৩৬ এর মাধ্যমে সম্পত্তিটি রেজিস্ট্রি করা হয় প্রকৃত মূল্যের পরিবর্তে মাত্র ৬ কোটি টাকা প্রদর্শন করে। ওই টাকা অলিখিতভাবে দাতা-গ্রহীতার মধ্যে লেনদেন হয়েছে। এর ফলে সরকার প্রায় ৫৪ লাখ ৮১ হাজার ৮৯৬ টাকা কর, ভ্যাট, উৎস আয়কর ও ফি থেকে বঞ্চিত হয়।ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শালধর বাজার এলাকার বাসিন্দা মরহুম আবদুল হামিদের ছেলে জামাল উদ্দীন মজুমদার ভবনটি বিক্রি করেছেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা নজির আহমদের ছেলে মোহাম্মদ সরোয়ারকে।অভিযোগে বলা হয়, এই তিনজনের যৌথ ভূমিকার মাধ্যমেই কোটি টাকার কর ফাঁকি সম্ভব হয়েছে। প্রকৃত মূল্যের ভিত্তিতে ১০ হাজার ৩৫০ বর্গফুট আয়তনের ভবনসহ সম্পত্তি বিক্রিতে সরকারের ভ্যাট, উৎস আয়কর, স্ট্যাম্প ফি ও স্থানীয় রেজিস্ট্রি ফি বাবদ লাখো টাকা পরিশোধের কথা ছিল। কিন্তু দলিলে মূল্য কম দেখানোর ফলে সব মিলিয়ে প্রায় ৫৫ লাখ টাকার মতো কর ফাঁকি দেওয়া হয়।অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামের রেজিস্ট্রি কার্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি, ঘুষ ও কারসাজির জন্য কুখ্যাত। এখানে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য গোপন করে কম দামে দলিল রেজিস্ট্রির ঘটনা নতুন কিছু নয়। স্থানীয় সূত্র বলছে, প্রতিদিনই এ ধরনের অসংখ্য দলিল সম্পাদিত হয়, যেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে সরকারি কর ফাঁকি দিতে সহায়তা করে।একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে এটি এক অঘোষিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। জনগণ জানে, অসাধু কর্মকর্তাকে ঘুষ দিলেই কর ফাঁকি দেওয়া সম্ভব।’অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার খন্দকার জামীলুর রহমান সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, ‘অভিযোগের প্রেক্ষিতে চান্দগাঁও সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মামুনুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমরা তদন্ত করে দেখছি। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।’অভিযোগকারী মিন্টু বলেন, ‘সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মামুনুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিকবার অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও কেন কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি? প্রশাসনের নীরবতা আসলে কি তাঁকে আরও দুঃসাহসী করে তুলেছে?’আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের সত্যতা মিললে এটি হবে একটি স্পষ্ট অর্থনৈতিক অপরাধ। শুধু সরকারি অর্থ আদায়ের ব্যবস্থাই নয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা সম্ভব।রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ সরোয়ার ৬ তলা ভবনটির ক্রেতা। তিনি দলিলে প্রকৃত মূল্য গোপন করে সরকারের ভ্যাট ও রাজস্ব ফাঁকিতে অংশ নেন।ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শালধর বাজার এলাকার জামাল উদ্দীন মজুমদার ভবনটির বিক্রেতা। তিনি দলিল দাতা হিসেবে উৎস করসহ প্রয়োজনীয় ফি পরিশোধ না করে সরকারি রাজস্ব ক্ষতিতে সহায়তা করেন।চান্দগাঁওয়ের সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মু. মামুনুল ইসলাম। অভিযোগ, তিনি মোটা অংকের ঘুষ গ্রহণ করে কম দামে দলিল রেজিস্ট্রি করেন। বর্তমানে মামুনুল ইসলাম কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত আছেন। অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে একাধিকবার কল দেওয়ার পরেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।এফএস
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
