কক্সবাজারের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী উখিয়া উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছিল। মামলা বাণিজ্য, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড, সবকিছু প্রতিদিনের নিত্যনতুন ঘটনায় পরিণতি হয়।এসব অপরাধ দমনে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরিফ হোসেনের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠে স্থানীয়রা। এসবের কড়া সমালোচনা করে আজ বৃহস্পতিবার অভিযোগ করেন স্থানীয় একাধিক ভুক্তভোগীর পরিবার।তারেক নামে এক ভুক্তভোগী বলেছেন, ‘ওসি আরিফ বিদায় হয়েছে তার সম্মানে এবং নিয়মতান্ত্রিক। কিন্তু তার কোনো শাস্তি উখিয়ার মানুষ দেখেনি। তাঁর এত অপরাধ থাকা শর্তেও কিভাবে কক্সবাজার জেলার ভেতর নিয়মতান্ত্রিকভাবে বদলি হয়, আমাদের বোধগম্য নয়।’তথ্য সূত্র বলছে, উখিয়ায় আরিফ হোসেন দায়িত্ব থাকা সময়ের ১১ মাসে ৬৫ জনের অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর পাশাপাশি শতাধিক চুরি, অর্ধশতাধিক ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনাও রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের ধরে ধরে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠে আসে তার বিরুদ্ধে।সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের আন্দোলনে পুলিশের লাঠিচার্জ ও এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে লাথি মারার ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হলে ব্যাপক সমালোচনায় পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত তাকে রামু থানায় বদলি করা হয়।স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ওসি আরিফের দায়িত্বকালে উখিয়ায় একের পর এক মৃত্যু ও অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটে।আগস্ট মাসে: বসতবাড়িতে হামলায় গোল মেহের নামে এক নারী নিহত হন, পানিতে ডুবে সাড়ে তিন বছরের শিশুর মৃত্যু, জেলের লাশ উদ্ধার, অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধারসহ একাধিক ঘটনা ঘটে।জুলাই মাসে: অজ্ঞাত বৃদ্ধার লাশ, শিশু হত্যা, ইউপি সদস্যের বস্তাবন্দী লাশ, অপহরণের শিকার যুবকের লাশ, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ইত্যাদি ঘটে।এপ্রিল-মে মাসে: জমি বিরোধে চারজনের মৃত্যু, কলেজ শিক্ষক খুন, বন্যহাতির আক্রমণে কৃষকের মৃত্যু, সড়ক দুর্ঘটনায় ইউপি সদস্য নিহত, স্ত্রী হত্যার ঘটনা, আত্মহত্যা, ট্রাকচাপায় মৃত্যু, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারসহ নানাবিধ হত্যাকাণ্ড ও মৃত্যু ঘটে।এছাড়া গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রায় প্রতিমাসেই একাধিক হত্যাকাণ্ড, আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা ও অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।এ ছাড়া নিরহ মানুষদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরলেও গ্রেফতার না করাসহ নানা অপরাধে ওসির বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছিল স্থানীয়রা। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা ওসিকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারিও দেন।সর্বশেষ শিক্ষককাণ্ডের ঘটনায় দেশজুড়ে মিডিয়ার হেডলাইন হন এই ওসি। তার প্রত্যাহার ও নানা শাস্তি আদায়ে দাবিও তুলেন। এসব হওয়ার আগেই তার বদলির গুঞ্জন চলে আসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের আন্দোলনের সমন্বয়ক সাইদুল ইসলাম শামীম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ লাঠিচার্জ করে, টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলে এবং থানায় নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। এক অন্তঃসত্ত্বা নারী শিক্ষককে লাথি মেরে আহত করা হয়, এখনো তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আমরা সংশ্লিষ্ট ওসিকে প্রত্যাহারের দাবি করেছিলাম, কিন্তু বদলি করা হয়েছে।’পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘গত ৫৩ বছরের ইতিহাসে উখিয়ার আইনশৃঙ্খলা এতটা খারাপ হয়নি। সাবেক ওসি আরিফ মিথ্যা মামলা দিয়ে মানুষকে ঘরছাড়া করেছেন, মামলা বাণিজ্য চালিয়েছেন। তাকে অনেক আগেই বদলি করা উচিত ছিল।’এক সিনিয়র সাংবাদিক জানান, ‘উখিয়ার বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নজিরবিহীন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ থানায় একজন দুর্বল ওসি দায়িত্ব পালন করলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।’জানা গেছে, ব্যাপক সমালোচনা-সমালোচনার মুখে পড়ে উখিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ আরিফ হোসেনকে রামু থানায় বদলি করা হয়েছে। তার স্থলে গত বুধবার নতুন ওসি হিসেবে যোগদান করেছেন মোহাম্মদ জিয়াউল হক।স্থানীয়রা আশা করছেন, নতুন ওসির নেতৃত্বে উখিয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আবারও স্বাভাবিক হবে।কক্সবাজার জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘উখিয়া থানার ওসি আরিফ হোসেনকে বদলি করা হয়েছে। নতুন করে দায়িত্ব পেয়েছেন জিয়াউল হক। এটি পুলিশের নিয়মিত বদলি।’এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
