দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রাণরেখা কক্সবাজার মহাসড়ক। প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের চলাচলে এ সড়কে দুর্ঘটনা প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। আর এসব দুর্ঘটনায় আহতদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত ট্রমা সেন্টারটি এক সময় আশার আলো দেখিয়েছিল স্থানীয়দের। কিন্তু সেই আশার আলো আজ নিভু-নিভু–অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম আর নিম্নমানের সংস্কারকাজে এটি যেন আবারও পরিণত হচ্ছে ‘অচল কেন্দ্র’-এ।লোকচক্ষুর আড়ালে বহু বছর অচল পড়ে ছিল লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টার। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, যন্ত্রপাতি কিংবা অবকাঠামোগত সুবিধা–কোনোটিই ছিল না চালুর মতো। দক্ষিণ চট্টগ্রামের জনগণের আন্দোলন ও দীর্ঘদিনের দাবির মুখে গত বছরের জুলাই মাসে অবশেষে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সংস্কারের জন্য সাড়ে ২২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। কাজের দায়িত্ব পায় ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাবর এন্টারপ্রাইজ।সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ১৫ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করে হস্তান্তরের কথা থাকলেও বাস্তবে যা ঘটেছে, তা এক ধরনের ‘সংস্কারের নামে দায়সারা খেলা’। অভিযোগ উঠেছে–বরাদ্দের অর্ধেক টাকারও সঠিক ব্যবহার হয়নি।স্থানীয় সূত্র বলছে, দেয়াল রং, মেঝে টাইলস, দরজা-জানালা সংস্কার, ছাদের ঢালাই, পানির ট্যাংক বসানো, ড্রপ ওয়ালের ফাটল মেরামত–এসব কাজের অর্ধেকই হয়নি। ছয়টি পানির ট্যাংক বসানোর কথা থাকলেও বসানো হয়েছে মাত্র দুটি। টয়লেট সংস্কার হয়েছে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে। ছাদে পানি পড়লেই দেয়ালের রং উঠে যাচ্ছে। পুরোনো জায়গায় হালকা রং করে নতুন কাজের ভান তৈরি করা হয়েছে।একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, ‘দ্রুত বিল তুলতে গিয়ে পুরো প্রকল্পটাই নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। বরাদ্দের অর্ধেকও কাজে লাগেনি। দেয়ালের রং বৃষ্টির পানিতেই উঠে যাচ্ছে।’কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে ঠিকাদারের প্রতিনিধি সাইড সুপারভাইজার মনছুর আহমদ জানান, ‘আমাদের যেভাবে কাজ করতে বলেছে, আমরা সেভাবে কাজ করেছি।’ তবে শিডিউল অনুযায়ী কাজ হয়েছে কিনা জানতে চাইলে কোনো উত্তর দিতে পারেননি।চট্টগ্রাম গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী জাহিদুল হাসান সময়ের কন্ঠস্বরের কাছে অবশ্য দাবি করেছেন, ‘সংস্কার কাজ পরিদর্শন করেছি। কিছু কাজ এখনো শেষ হয়নি। যেগুলো অসম্পূর্ণ, তা পুনরায় করা হবে।’কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। অসম্পূর্ণ দেয়াল, ফিনিশিংবিহীন করিডর, বেখাপ্পা বৈদ্যুতিক সংযোগ, পানির লাইনে গোলযোগ–সব মিলিয়ে সেন্টারটি এখনো কার্যকরভাবে ব্যবহারের উপযুক্ত হয়নি।লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ইকবাল হোছাইন বলেন, ‘ট্রমা সেন্টার চালুর জন্য শুরু থেকেই আমরা চেষ্টা করেছি। কিন্তু সংস্কারকাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে কাজ করছে। বরাদ্দের সিডিউলে যেসব কাজ করার কথা ছিল, তার অধিকাংশই করা হয়নি। যেগুলো হয়েছে সেগুলোও নিম্নমানের। দেয়াল অসম্পূর্ণ, বৈদ্যুতিক কাজ ঠিক হয়নি। অথচ ঠিকাদার বারবার আসে শুধু বিল তুলতে।’তিনি আরও বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও সেন্টার কার্যকরভাবে চালু হবে না। জনগণের টাকা নষ্ট হয়ে যাবে।’দক্ষিণ চট্টগ্রামের জনগণের প্রত্যাশা ছিল–এই ট্রমা সেন্টার একদিন দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির ফাঁদে পড়ে জনগণের সেই আশা আবারও ভঙ্গ হতে চলেছে।স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল জানিয়েছেন, ‘এ মহাসড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ। কার্যকর ট্রমা সেন্টার ছাড়া অসংখ্য জীবন ঝুঁকিতে থাকবে। দ্রুত সংস্কারের ত্রুটি সংশোধন ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু না করলে জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি আবারও অচল হয়ে পড়বে।’এইচএ
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
