যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবীরা ওষুধ চুরিসহ নানা অনিয়মে জড়িয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের কারণে সরকারি এই হাসপাতালে একের পর এক বদনাম রটছে। কর্মচারী সংকটের অজুহাতে সংশ্লিষ্টরা সুবিধা নিয়ে তাদের হাসপাতালে কাজ দেয়ায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তারা (স্বেচ্ছাসেবীরা) হাসপাতালের পরিচয়পত্র পুঁজি করে লুটপাটে ব্যস্ত রয়েছেন।হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. কামরুল ইসলাম বেনু ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ৪২ জনকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বিনা বেতনে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেন। ২০১৯ সালের জুন ও জুলাই মাসে ৩০ জনকে জনগোষ্ঠী সহায়তায় নিয়োগ দেন আরেক সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু। এরপর থেকে স্বেচ্ছাসেবী কর্মচারীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে খাতা-কলমে ৯২ জনের তালিকা থাকলেও বাস্তবে স্বেচ্ছাসেবীদের সংখ্যা প্রায় দেড়শ’। কর্মকর্তাদের অবগত না করেই দায়িত্বশীল কর্মচারীরা ইচ্ছামতো স্বেচ্ছাসেবীদের হাসপাতালের কাজে নিয়োজিত করছেন, যাদের অধিকাংশ নারী।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া দুই ধরনের। একটি সরাসরি নিয়োগ ও অপরটি ঠিকাদারের মাধ্যমে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে কর্মচারী নিয়োগ। সেই অনুযায়ী যশোর জেনারেল হাসপাতালে বহিরাগত নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রক্রিয়া মানা হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে নিয়োগ বোর্ড গঠন করে তাদের নিয়োগ দিয়েছে।হাসপাতালের নিজস্ব কিছু কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সরকারি এই হাসপাতালে রাজস্ব খাতে কর্মচারী রয়েছে ১৭৬ জন। হাসপাতালের মোট ৯টি ওয়ার্ড ও বর্হিবিভাগের জন্য কী এই কর্মচারীরা যথেষ্ট না—প্রশ্ন তাদের। হাসপাতাল বহিরাগতদের হাতে তুলে দেয়াকে ভালো চোখে দেখছেন না তারা।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, অস্ত্রোপচার কক্ষ, পুরুষ ও মহিলা সার্জারি ওয়ার্ড, পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ড, পুরুষ ও মহিলা পেয়িং ওয়ার্ড, মডেল ওয়ার্ড, লেবার ওয়ার্ড, গাইনি ওয়ার্ড, সংক্রামক ওয়ার্ড এবং শিশু ওয়ার্ডে সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি বহিরাগতরাও দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সরকারিভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীরা একটু কৌশলে আর বহিরাগতরা প্রকাশ্যে অর্থবাণিজ্যে লিপ্ত। টাকা ছাড়া কোনো কাজ করেন না তারা। দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বাণিজ্য চলে আসছে। বর্তমানে বাণিজ্যে বেড়েছে কয়েক গুণ।জানা গেছে, যেকোনো কাজে তারা ২শ’ টাকার কম নিচ্ছেন না। বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগীর স্বজন রহিমা খাতুন, আব্দার রহমান, পারভিনা বেগমসহ অনেকেই জানান, ক্যাথেটার লাগাতে গেলে টাকা ও খুলতে গেলে টাকা দিতে হয়। টলি ঠেলতে গেলে টাকা নেয়া হয়। ড্রেসিং করতে গেলে টাকা দেয়া লাগে। প্লাস্টার করাতে গেলে টাকা গুণতে হয়। বিষ ওয়াশ করতেও রোগীর স্বজনদের কাছে টাকা দাবি করা হচ্ছে। এমনকি টাকা ছাড়া মিলছে না শয্যাও। প্রসূতি ওয়ার্ড ও লেবার ওয়ার্ডে বখশিসের নামে ৫’শ থেকে ১ হাজার টাকা দাবি করা হয়। ছেলে সন্তান হলে ১ হাজার ও মেয়ে সন্তান হলে ৫’শ টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে রোগীর স্বজনদের সাথে খারাপ আচরণ করেন ওয়ার্ডবয় ও আয়ারা।সম্প্রতি, শিশু ওয়ার্ডে স্বেচ্ছাসেবী সোনিয়া ও আউটসোর্সিংয়ের কর্মচারী আরিফ হোসেন রোগীদের ছাড়পত্র নিয়ে একটি টেবিলে বসেন। এরপর রোগীর নাম ধরে টেবিলের কাছে ডাকেন। এসময় প্রতিজনের কাছ থেকে ১শ’ টাকা নেয়ার পর ছাড়পত্র দেয়া হয়। যার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করাকালীন ৭৮ পিস সরকারি ইনজেকশন চুরি করে ধরা পড়ে দুই স্বেচ্ছাসেবী কহিনুর ও পলি। এর মধ্যে ৩৯ পিস গ্যাসের ইনজেকশন প্যানটিক্স ও ৩৯ পিস এন্টিবায়োটিক সেফটিএক্সোন ইনজেকশন ছিল। পরে তাদের বরখাস্ত করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কহিনুর ও পলি সম্পর্কে শাশুড়ি-বউমা। কহিনুর মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে ও তার বউমা পলি গাইনি ওয়ার্ডে কর্মরত ছিলেন।এর আগে মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে ড্রেসিং বাণিজ্যের অভিযোগে কহিনুর আক্তারকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল থেকে বের করে দিয়েছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান। একজন রোগীকে যে কয়বার ড্রেসিং করবেন, ততবার কহিনুরকে ১শ’ টাকা করে দিতে হতো। শুধু তাই নয়, কহিনুর রোগীর জন্য ওষুধ কেনার জন্য স্বজনদের হাতে শর্ট স্লিপ ধরিয়ে দিতেন। এরপর ইনজেকশন, সিরিঞ্জ, স্যালাইন, সুই সুতো নিয়ে তিনি রোগীদের চিকিৎসা করতেন।এদিকে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই ভোরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের স্টোর রুম থেকে মালামাল ভর্তি ৪টি বস্তা চুরি করে নিয়ে যায় হৃদয়সহ দুই স্বেচ্ছাসেবী ওসমান ও হৃদয়। ওই বস্তায় মূল্যবান ওষুধ, প্লাস্টার, সুতাসহ অন্যান্য মালামাল ছিল। মালামাল নিয়ে যাওয়ার সময় হাসপাতালের বাইরে তারা ধরা পড়েন। পরের দিন বিকেলে চুরি হওয়া ৪টি বস্তা স্বেচ্ছাসেবী হৃদয়ের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়। হৃদয়ের বাড়ি সদর উপজেলার ইছালী গ্রামে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে বস্তাগুলো খোলার পর তাতে বিভিন্ন ওষুধ সামগ্রীর কার্টন ও পুরাতন কাগজপত্র পাওয়া যায়। এ ঘটনায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অর্থোপেডিক বিভাগের ডা. আব্দুর রশিদকে সভাপতি করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।সূত্র জানায়, বর্তমানে সরকারি এ হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবীদের দাপট চলছে। তারা রোগীর সেবার নামে লুটপাটে ব্যস্ত রয়েছেন। তাদের কর্মকাণ্ডে সরকারি হাসপাতালের দুর্নাম ছড়িয়ে পড়ছে। কর্তৃপক্ষের সঠিকভাবে তদারকি ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা না থাকায় স্বেচ্ছাসেবীরা ফ্রি স্টাইলে অনিয়মের সুযোগ পাচ্ছেন। তাদের লাগাম টানতে না পারলে হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবীদের রাজত্ব চলতেই থাকবে।এই বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, স্বেচ্ছাসেবীদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। সংশোধন হওয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এরপরেও যদি কেউ বাণিজ্যে লিপ্ত থাকে, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালে কাজ করার সুযোগ দেয়া হবে না। ইতোমধ্যে রুপা নামে এক স্বেচ্ছাসেবীকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।এইচএ

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রের ২ জনসহ আটক ৯
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রের ২ জনসহ আটক ৯

জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) ও পুলিশের যৌথ অভিযানে নওগাঁয় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের ২ জনসহ ৯ জনকে Read more

‘স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাব’
‘স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাব’

ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। এই চুক্তির প্রথম ধাপের বাস্তবায়ন Read more

বড় পর্দায় সাবিলা নূরের অভিনয় দেখে যা বললেন শাশুড়ি
বড় পর্দায় সাবিলা নূরের অভিনয় দেখে যা বললেন শাশুড়ি

ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাবিলা নূর। তবে এবার তাকে দেখা গেল বড় পর্দায়। আর পুত্রবধূর সেই কাজ দেখতে সিনেমা হলে Read more

‘গাড়িটা মাকে আর দেহটা বাবাকে দিও’ খোলা চিঠি লিখে যুবকের আত্মহত্যা
‘গাড়িটা মাকে আর দেহটা বাবাকে দিও’ খোলা চিঠি লিখে যুবকের আত্মহত্যা

‘আমি নিজ ইচ্ছায় মৃত্যু বরণ করতেছি, আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী থাকবে না। আমার মৃত্যুর পর দেহ আমার বাবার কাছে Read more

দেশব্যাপী লোডশেডিং, থাকবে যতদিন
দেশব্যাপী লোডশেডিং, থাকবে যতদিন

যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হঠাৎ বেশ কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সারাদেশে লোডশেডিং শুরু হয়েছে। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আরও Read more

গাজীপুরে চারটি আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হলেন যারা
গাজীপুরে চারটি আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হলেন যারা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুরের ৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে।সোমবার (৩ নভেম্বর) বিকেলে Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন