গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে জটিলতা দেখা দিয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ আগে কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা হামাস মেনে নিলেও ইসরায়েল এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব দেয়নি। অথচ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করছেন, তিনি “অবিলম্বে” সব জিম্মিকে মুক্ত করার জন্য এবং যুদ্ধ শেষ করতে আলোচনা শুরু করছেন।এই নীরবতা আসলে ইসরায়েলের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা মধ্যস্থতাকারী এবং জিম্মিদের পরিবারকে বিভ্রান্ত করেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, নেতানিয়াহু তাদের প্রিয়জনদের ত্যাগ করেছেন।গত দেড় বছর ধরে ইসরায়েল কেবল আংশিক ও ধাপে ধাপে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছিল। কিন্তু এবার নেতানিয়াহু দাবি করছেন, সব জিম্মির মুক্তি এবং যুদ্ধের সমাপ্তি, সবকিছু একসাথে সমাধান করতে হবে, তাও ইসরায়েলের শর্তে। এদিকে তিনি একইসঙ্গে গাজা সিটির বিরুদ্ধে বিশাল সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিও জোরদার করছেন।নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার ঘোষণা দেন, তার দলকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে অবিলম্বে আলোচনা শুরু করার জন্য। তবে তিনি একবারও উল্লেখ করেননি সেই প্রস্তাবটির কথা, যেখানে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে অর্ধেক জিম্মি মুক্তির কথা বলা আছে। ইসরায়েলের দাবি, এই হামলার ভয় দেখানোই হামাসকে ছাড় দিতে বাধ্য করছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, সামরিক চাপ বাড়াতে থাকলে হামাস আরও নমনীয় হতে বাধ্য হবে। তবে প্রায় দুই বছরের যুদ্ধেও হামাস পুরোপুরি দমে যায়নি।এদিকে জেরুজালেমের কাছে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে। তারা জিম্মিদের মুক্তি ও সরকারকে গাজা নগরী দখলের পরিকল্পনা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। নেতানিয়াহু হঠাৎ করে আংশিক থেকে পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা কাঠামোয় কেন গেলেন, তা ব্যাখ্যা করেননি। এতে দেশি-বিদেশি মহলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ সদস্য বাসেম নাঈম বলেন, আন্দোলন যুদ্ধবিরতির জন্য সবকিছু দিয়েছে এবং এখনো দায়িত্বশীলভাবে সমঝোতায় বসতে প্রস্তুত। তিনি অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের “সবুজ সংকেত” পেয়ে এক ধরনের নোংরা খেলা চালাচ্ছেন।অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইসরায়েলের নতুন অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হামাসকে “ধ্বংস না করা পর্যন্ত” জিম্মিদের ফেরানো সম্ভব নয়। এ বক্তব্যের পর থেকেই নেতানিয়াহু আংশিক নয়, বরং সর্বাত্মক চুক্তির কৌশলে ঝুঁকেছেন।ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভায় যুদ্ধ শেষের জন্য পাঁচটি শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, এগুলোর মধ্য রয়েছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, সব জিম্মির মুক্তি, গাজার সামরিকীকরণ রোধ, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কোনো প্রশাসন গড়ে তোলা। কিন্তু হামাস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নিরস্ত্রীকরণ তাদের কাছে “অগ্রহণযোগ্য।”বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু আসলে দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছেন। একদিকে যুদ্ধবিরতির কথা বলছেন, অন্যদিকে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে, যুদ্ধ দীর্ঘ হচ্ছে, আর তার রাজনৈতিক টিকে থাকাও নিশ্চিত হচ্ছে।কিন্তু হামাস নিরস্ত্রীকরণের শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর দ্বৈত বার্তা আসলে সময় নষ্ট করার রাজনৈতিক কৌশল, যা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছে এবং তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখছে। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও নেতানিয়াহু গাজার পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতে রাখতে চান। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে গাজায় কেউ বিনিয়োগ করবে না, অঞ্চলটি স্থায়ী সংঘাতে আটকে থাকবে।অন্যদিকে, জরিপে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ইসরায়েলি নাগরিক জিম্মি ফেরত আনার জন্য যেকোনো সমঝোতাকেই সমর্থন করছে। কিন্তু নেতানিয়াহুর চরম ডানপন্থি জোটসঙ্গীরা যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধের সমাপ্তির বিরোধিতা করছেন। তাদের হুমকি, এতে সরকার ভেঙে পড়তে পারে।নেতানিয়াহুর এই অবস্থানে জিম্মি পরিবারের সদস্যরা সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ। তারা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন যে, চুক্তি না করে জিম্মিদের জীবন বিপন্ন করা হচ্ছে। নেয়ানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। মঙ্গলবার রাতে আবারও বড় বিক্ষোভের ডাক দেয়া হয়েছে। এক মা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অযৌক্তিক শর্ত দিচ্ছেন, সেনাদের মৃত্যুকূপে ঠেলছেন, আর আমাদের সন্তানদের মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছেন।”তবে সমালোচনার জবাবে নেতানিয়াহুর দপ্তর জানিয়েছে, আলোচনার জন্য শিগগিরই তারা দল পাঠাবে, যদিও বৈঠকের স্থান এখনও ঠিক হয়নি। ফলে যুদ্ধ শেষের প্রতিশ্রুতি আর গাজায় সামরিক অভিযানের বাস্তবতা, দুই বিপরীত পথেই এগোচ্ছেন নেতানিয়াহু।সূত্র : সিএনএন এবি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
