চট্টগ্রামের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা দেওয়ানহাট ওভারব্রিজ–যা একসময় নগরীর গর্ব, আজ তা পরিণত হয়েছে নগরবাসীর অস্বস্তি ও ভয়ভীতির প্রতীকে। ষাটের দশকে পাকিস্তান আমলে যাত্রা শুরু করা এই ব্রিজটি সময়ের বিবর্তনে আজ হয়ে উঠেছে ঝুঁকির আরেক নাম। প্রকৌশলীদের ভাষায়, ব্রিজটির স্ট্রাকচারাল আয়ুষ্কাল বহু আগেই ফুরিয়েছে; প্রতিটি পিলার, গার্ডার আর রডের শরীরে জর্জরিত ক্ষয়ের চিহ্ন স্পষ্ট। তবু শহরের দুই ভাগকে একত্রে বেঁধে রাখতে আজও এই সেতুই ভরসা।ষাটের দশকের মাঝামাঝি ‘দ্য ইঞ্জিনিয়ার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই ওভারব্রিজটির নির্মাণ কাজ শুরু করে। তবে নির্মাণকালীন কিছু ত্রুটি ধরা পড়ায় স্বাধীনতার পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে ১৯৭৯ সালে বড় ধরনের সংস্কারের মাধ্যমে আবারও যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ব্রিজটি। তখন থেকেই বলা চলে জোড়াতালি দিয়েই ব্রিজটি টিকে আছে।নির্মাণকালে না ছিল আধুনিক স্টিল সেক্টর, না ছিল উন্নত প্রযুক্তি। ব্যবহার করা হয়েছিল স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ‘বাংলা রড’। ফলে কাঠামোটি শুরু থেকেই ছিল সীমিত সক্ষমতার। অথচ বর্তমানে এটি ধারণ করছে স্বাভাবিক বহনক্ষমতার বহু গুণ বেশি ওজন। ষাটের দশকে কল্পনাও করা যায়নি এমন সব মালবাহী ট্রাক, কনটেইনারবাহী ট্রেইলার কিংবা বাস প্রতিদিন দাপিয়ে চলেছে এই ব্রিজের উপর দিয়ে।সংস্কারের নামে দেওয়া হয়েছে বহুবার পিচঢালাই। কিন্তু প্রকৌশল শাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী রিসাইক্লিং পদ্ধতিতে পুরনো পিচ খুঁড়ে নতুন ঢালাই করার পরিবর্তে কেবল ওপরের স্তরে ঢালা হয়েছে হাজার টন পিচ। এতে শুধু ব্রিজ উঁচুই হয়নি, বেড়েছে নিজস্ব ওজনও–যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ডেথ ওয়েট। এই বাড়তি ভার প্রতিনিয়তই ক্ষতবিক্ষত করছে ব্রিজটির ভিতরকার দুর্বল কাঠামোকে।আজ ব্রিজটির প্রতিটি পিলার ও গার্ডার ফাটলে ভরা। কোথাও খসে পড়েছে ঢালাই, কোথাও মরিচায় ক্ষয়ে বেরিয়ে পড়েছে সেকালের রড। বহু জায়গায় গজিয়ে উঠেছে গাছগাছালি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল কাঠামোতে আর সংস্কার সম্ভব নয়। “এটি এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা–যে কোনো দিন ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটতে পারে,” তারা স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন।চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ নুরুল করিম স্বীকার করে সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, ব্রিজটির অবস্থা ভয়াবহ। তবে রেললাইনের উপর ব্রিজ নির্মাণে উচ্চতার বাধ্যবাধকতা বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেওয়ানহাট ওভারব্রিজের উচ্চতা প্রায় ৫ মিটার। অথচ নতুন আইনে রাখতে হবে কমপক্ষে ৮.৫ মিটার বা প্রায় ২৮ ফুট। এতো উঁচুতে নির্মাণ করলে ব্রিজে ওঠানামার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা মেলে না–না দেওয়ানহাট প্রান্তে, না টাইগারপাসে। ফলে বিকল্প স্থানে ব্রিজ নির্মাণের সম্ভাবনা যাচাইয়ে পরামর্শক নিয়োগের চিন্তাভাবনা করছে কর্তৃপক্ষ।অন্যদিকে লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত নির্মিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে আগ্রাবাদে ওঠা–নামার র‌্যাম্প যুক্ত করে এই এক্সপ্রেসওয়েকেই দেওয়ানহাট ব্রিজের বিকল্প করারও চিন্তা চলছে।তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এভাবে বিকল্প তৈরি সম্ভব নয়। শহরের যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখতে হলে ব্রিজটি যথাস্থানে পুনর্নির্মাণই জরুরি। তাদের ভাষায়, রেলওয়ের উচ্চতার আইন শিথিল করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। “আইন মানুষের জন্য, মানুষ আইনের জন্য নয়,” মন্তব্য করেন একাধিক নগর বিশেষজ্ঞ।অপর এক প্রকৌশলী বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন–“রেলওয়ে স্টেশন পাহাড়তলীতে সরিয়ে নেওয়া গেলে শহরের কদমতলী কিংবা দেওয়ানহাট অনেকটা মুক্ত হবে। এতে মূল রেলপথ শহরের ভেতর থেকে সরে গিয়ে সহজ হবে যান চলাচল।”প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করছে এই ব্রিজ দিয়ে। নিচে ছুটে চলছে রেলগাড়ি, ওপরে গাড়ির স্রোত। অথচ প্রতিটি যাত্রা এক অজানা ঝুঁকি বয়ে আনছে। অনেকেই বলছেন, এই ব্রিজের উপর দিয়ে চলতে গেলে মনে হয় ‘জীবনটা যেন ভাগ্যের হাতে সঁপে দেওয়া’।চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন সময়ের কন্ঠস্বর-কে জানিয়েছেন, শুধু দেওয়ানহাট নয়, নগরীর ৫০ বছরের বেশি পুরোনো সব ব্রিজ নিয়ে একটি সার্ভে শুরু হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি বায়েজিদ এলাকায় একটি ব্রিজ ভেঙে পড়ার পর এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। “ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজগুলো নিয়ে অবশ্যই বড় ধরনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে।”দেওয়ানহাট ওভারব্রিজকে নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান আখ্যা দিয়েছেন ‘নগরের হৃদস্পন্দন’ হিসেবে। তার মতে, এই ব্রিজ ধসে পড়লে শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একেবারে স্থবিরতা নেমে আসবে। “তাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে,” বলেন তিনি।ষাট বছরের বেশি পুরনো দেওয়ানহাট ওভারব্রিজ এখন দাঁড়িয়ে আছে অচলাবস্থার দ্বারপ্রান্তে। একদিকে ইতিহাসের সাক্ষী এই স্থাপনা, অন্যদিকে নগরের শিরায়-শিরায় জড়িয়ে থাকা যোগাযোগের মূল সেতু। ভেঙে পড়ার আগেই এর সমাধান না হলে নগরীর প্রাণকেন্দ্রে ঘটতে পারে অকল্পনীয় বিপর্যয়।এনআই

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
আশুলিয়ায় আর্মি ক্যাম্পের অভিযানে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেফতার ৫
আশুলিয়ায় আর্মি ক্যাম্পের অভিযানে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেফতার ৫

আশুলিয়ার ভাদাইল এলাকা থেকে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্রসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে সেনাবাহিনীর জামগড়া আর্মি ক্যাম্প।বুধবার Read more

চার স্কুলছাত্রীকে আটকে রেখে ধর্ষণ, শিক্ষক গ্রেপ্তার
চার স্কুলছাত্রীকে আটকে রেখে ধর্ষণ, শিক্ষক গ্রেপ্তার

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় চার স্কুলছাত্রীকে আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগে পাগলা উচ্চ বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক মিজানুর রহমান ওরফে মিজান (৪৫) গ্রেপ্তার করেছে Read more

তারাগঞ্জে ঔষধের দোকানের তালা কেঁটে দুর্ধর্ষ চুরি
তারাগঞ্জে ঔষধের দোকানের তালা কেঁটে দুর্ধর্ষ চুরি

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় একটি ঔষধের দোকানের সাটারের তালা কেঁটে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটেছে।সোমবার (১২ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে এ চুরির ঘটনা Read more

মাইলস্টোনে আহত-নিহতদের তালিকা তৈরিতে কমিটি গঠন
মাইলস্টোনে আহত-নিহতদের তালিকা তৈরিতে কমিটি গঠন

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাসে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় হতাহতদের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ এবং আহত, নিহত ও নিখোঁজদের Read more

নেত্রকোনায় নিখোঁজের ৪০ ঘণ্টা পর আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার, মোট নিহত ৪
নেত্রকোনায় নিখোঁজের ৪০ ঘণ্টা পর আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার, মোট নিহত ৪

নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ির ধনু নদীতে বরযাত্রীবাহী স্পিডবোট ডুবে নারীশিশুসহ চারজনের নিখোঁজের ৪০ ঘন্টা পর আরও এক জনের মরদেহ ভেসে ওঠলে স্থানীয়রা Read more

ইরান যুদ্ধ চলতে থাকলে বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিবে
ইরান যুদ্ধ চলতে থাকলে বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিবে

ইরান যুদ্ধ চলতে থাকলে তা বিস্তৃত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তুরস্কের গোয়েন্দা প্রধান ইব্রাহিম কালিন। এর Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন