পঞ্চগড়ের বিভিন্ন বাজারে প্রশাসনের চোখের আড়ালে গড়ে উঠেছে অনুমোদনহীন মিনি ফিলিং স্টেশন। সাধারণত, ফিলিং স্টেশন স্থাপন করার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের অনাপত্তিপত্র থেকে শুরু করে বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথসহ অন্তত সাতটি দফতরের অনুমতি নেয়ার বিধান আছে। তবে এসব ফিলিং স্টেশন গড়ে উঠেছে এসব নিয়মকে তোয়াক্কা না করেই।জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার তিস্তার হাটে ১টি, লক্ষীর হাটে ১টি, সোনাহারে ২টি, নুরুর বাজারে ১টি, ফুলবাড়ি বাজারে ১টি, টেপ্রীগঞ্জ বাজারে ১টি, বোদা উপজেলার মাড়েয়া বাজারে ২টি, বগদুলঝুলা বাজারে ১টি এবং সদর উপজেলার পানিমাছ পুকুর বাজারে ১টি, ফুটকিবাড়ি বাজারে ৩টি, তেপুকুরিয়ায় ১টিসহ মোট ১৪টি মিনি ফিলিং স্টেশনের সন্ধান পাওয়া গেছে।স্থানীয় মাড়েয়া বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ৩৮ নং মাড়েয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাত্র ৬০ মিটার দূরত্বে ডিসপেনসার বসিয়ে পেট্রোল ও ডিজেল বিক্রি করছেন ভাই ভাই ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল মালেক নামে এক ব্যবসায়ী। জানতে চাইলে তিনি জানান, বিদ্যালয়ের পাশে জ্বালানি তেল বিক্রির নিয়ম কানুনের ব্যাপারে তিনি জানেন না। আপাতত ট্রেড লাইসেন্স ও ফায়ার লাইসেন্স নিয়েছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছেন।একই বাজারের উত্তর পাশে রাজু পিওর অয়েলের মালিক রাজু বলেন, ‘আপাতত খুচরা তেল বিক্রি করছি। ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ ফিলিং স্টেশন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’ বিস্ফোরক পরিদপ্তর কিংবা জেলা প্রশাসকের অনাপত্তিপত্র নেই বলেও জানান তিনি।তিস্তারহাট বাজারে মেসার্স শামীমা ট্রেডার্স নামে রড, সিমেন্টের দোকানে খোলামেলাভাবেই চলছে পেট্রোল বিক্রি। দোকানের মালিক হাচান আলী বলেন, ‘বিস্ফোরক দফতর থেকে একবার পরিদর্শনে এসে পাম্প বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছিল। সেই সাথে যেকোন সময় অফিসিয়ালি পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে বলেও জানিয়েছিল।’অনুসন্ধানে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স ও রড-সিমেন্ট বা অন্যান্য ব্যবসা দেখিয়ে ফায়ার লাইসেন্স সংগ্রহ করে মালিকরা নিজেদের মিনি ফিলিং স্টেশনের জ্বালানি তেলের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে ফায়ার লাইসেন্স প্রদানকে বিশেষজ্ঞরা ‘আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়া’র শামিল। তাঁদের মতে, প্লাস্টিকের ড্রামে কিংবা জারিকেনে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কোনোভাবে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটালে আশপাশের দোকানপাট ও আবাসিক এলাকায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি এমনকি প্রাণহানির ঝুঁকিও তৈরি হবে।পঞ্চগড় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর রায়হান ইসলাম বলেন, ‘আমরা কোনো মিনি ফিলিং স্টেশনকে এখন পর্যন্ত ফায়ার লাইসেন্স দেইনি।’ তবে অভিযোগ আছে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা মিনি পাম্পের বিষয়টি জেনেও উৎকোচ গ্রহণ করে ফায়ার লাইসেন্স প্রদান করছেন।এদিকে রংপুর বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক অশোক কুমার দাস বলেন, ‘এসব মিনি ফিলিং স্টেশনকে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের লাইসেন্স প্রদানের কোন নিয়ম নেই। আমাদের নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের উপায় থাকে না। অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানালেও ওনারা সময় দিতে না পারায় এইসব পাম্প বন্ধে উদ্যোগ নিতে পারছি না।’জানা গেছে, একেকটা ডিসপেন্সারের দাম মাত্র ৫০-৬০ হাজার টাকা হওয়ায় অল্প পুঁজিতে এ ধরনের পাম্প বসানোর প্রবণতা বাড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে একেকটি মিনি পাম্প যেন ‘জ্যান্ত বোমা’। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এটি মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে আশঙ্কা করেন তারা।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের পরিচালক (অপারেশন্স ও পরিকল্পনা) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান বলেন, ‘এ ধরণের কোনো তথ্য পেলে আমরা যাচাই করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনের আওতায় নিয়ে আসবো।’পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ইউসুফ আলী বলেন, ‘ছাড়পত্র গ্রহণ ব্যতীত ফিলিং স্টেশনসমূহের কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রাখলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক সাবেত আলী বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে কেউ অভিযোগ দায়ের করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’আরডি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
