মহান মুক্তিযুদ্ধের এক টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের ঐতিহাসিক জাহাজমারা যুদ্ধ। কালের বিবর্তন আর প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুতে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে এই গৌরবগাথা। অথচ সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের দুরদর্শিতা ও সাহসিকতায় লেখা হয়েছিল এক নতুন ইতিহাস—যেখানে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়।এই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন কাদেরিয়া বাহিনীর অকুতোভয় যোদ্ধারা, বুক চিতিয়ে দাঁড়ান অস্ত্রধারী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে।১১ আগস্ট ১৯৭১: রক্তিম ইতিহাসের সূচনা১৯৭১ সালের ১১ আগস্ট—এটি ইতিহাসে খচিত হয়ে আছে ‘জাহাজমারা দিবস’ নামে। এদিন নারায়ণগঞ্জ থেকে যমুনা নদী হয়ে উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ৭টি যুদ্ধজাহাজ, বোঝাই ছিল মরণাস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি ও রসদ। ভূঞাপুরের মাটিকাটা এলাকায় এসে জাহাজগুলো নজরে আসে কাদেরিয়া বাহিনীর দুর্ধর্ষ, সাহসী ও চৌকস কমান্ডার হাবিবুর রহমান (বীরবিক্রম) এর।স্থানীয় জনতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তারা পরিকল্পনা করে জাহাজগুলোতে আক্রমণ চালান। মৃত্যুকে তুচ্ছ করে এই সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা এস.ইউ. ইঞ্জিনিয়ার্স এল.সি-৩ এবং এস.টি রাজন নামের দুটি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করে দেয়। পাক বাহিনীর কৌশল ও রসদ পরিবহণের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভেস্তে যায়।বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার দখল ও নজিরবিহীন সাফল্যমুক্তিযোদ্ধারা দখল করে নেন প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার বাক্স অস্ত্র ও গোলাবারুদ—যার তৎকালীন বাজারমূল্য ছিল আনুমানিক ২১ কোটি টাকা। ১১ আগস্ট থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত চলে তুমুল যুদ্ধ। এতে ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন, আহত হন অন্তত ২০ জন। এই যুদ্ধ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে পাকিস্তানি বাহিনী আর কোথাও এত বড় ক্ষতির মুখোমুখি হয়নি।সরাসরি নেতৃত্ব দেন নিয়াজি নিজেএই বিশাল ক্ষতির পর পাকিস্তানি বাহিনী পাগলের মতো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা জল, স্থল ও আকাশপথে অভিযান শুরু করে মাটিকাটা, সিরাজকান্দী ও ভূঞাপুর এলাকায়। অবাক করার মতো বিষয় হলো—এই অভিযান নিজে নেতৃত্ব দেন পূর্বাঞ্চলের পাকিস্তানি সেনাপ্রধান লে. জেনারেল এ. কে. নিয়াজি। তিনি ভূঞাপুর ডাকবাংলোয় অবস্থান নিয়ে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালান। কিন্তু শত চেষ্টা করেও হানাদার বাহিনী তাদের খোয়া যাওয়া অস্ত্র পুনরুদ্ধার করতে পারেনি।পাল্টা আক্রমণে পাকবাহিনীর বিপর্যয়৪৭ ব্রিগেডসহ পাকিস্তানি বাহিনী এই অঞ্চল দখলের চেষ্টা চালায়। দুইটি স্যাবর জেট দিয়ে বোমা হামলা চালানো হয়। তবুও কাদেরিয়া বাহিনীর দখলে থাকা অস্ত্র দিয়েই মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিহত করেন হানাদারদের। এই যুদ্ধে শুধু হানাদার নয়, স্থানীয় জনপদ, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি এবং অসংখ্য সম্পদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবুও কমেনি মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল।বীরবিক্রমের নেতৃত্বে জয়এই ঐতিহাসিক যুদ্ধে কমান্ডার হাবিবুর রহমানের অসীম সাহসিকতা পাকিস্তানি বাহিনীকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে। বাংলাদেশ সরকার তাকে “বীরবিক্রম” খেতাবে ভূষিত করে। এই যুদ্ধে তিনি শুধু একজন যোদ্ধা নন, হয়ে উঠেছিলেন একটি অধ্যায়ের প্রতীক।স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভামঙ্গলবার (১২ আগস্ট), ভূঞাপুরে ঐতিহাসিক জাহাজমারা দিবস উদযাপন উপলক্ষে একটি স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। সকালে উপজেলার মাটিকাটা এলাকার জাহাজমারা স্মৃতিস্তম্ভ চত্বরে এই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।সভায় সভাপতিত্ব করেন ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আবু আবদুল্লাহ খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টাঙ্গাইল জেলা জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক মন্ডল, চাঁদ মিয়া, নূরুল আমীন নান্নু, ফজলুল হক ভূঁইয়া প্রমুখ। বক্তারা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানার আহ্বান জানান।এই যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক বিজয় ছিল না, ছিল এক অদম্য আত্মত্যাগ আর স্বাধীনতার তৃষ্ণায় জর্জরিত জাতির আত্মপ্রকাশের গল্প। জাহাজমারা যুদ্ধ আজও স্মরণ করিয়ে দেয় মাটির মানুষ, সাহস আর বিশ্বাস নিয়ে কীভাবে রচিত হয়েছিল একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের ইতিহাস।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
