কক্সবাজারের উখিয়ার এক সময়ের কুখ্যাত ডাকাত সর্দার টিটু এখন ‘ইয়াবা সম্রাট’ নামে পরিচিত। তার উত্থান, দাপট এবং প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে স্থানীয়দের মনে জন্মেছে একের পর এক প্রশ্ন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বস্তুনিষ্ঠ তথ্য, অসংখ্য প্রমাণ এবং হাজারো ভুক্তভোগীর আহাজারি ও এলাকাবাসীর ফরিয়াদের মধ্যে কেউই টিটুর অপরাধযাত্রা থামাতে পারেনি; বরং দিন দিন তার শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর তার অপরাধ সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ন রয়েছে।স্থানীয় সূত্র বলছে, উখিয়া থানা ও জেলা পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি ইয়াবা সিন্ডিকেট। এই চক্র টিটুর কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা নেয় এবং তাকে অদৃশ্য নিরাপত্তা দেয়। ফলে মাদকবিরোধী অভিযানগুলো অনেকটাই লোক দেখানো নাটকে পরিণত হয়—শিশু-কিশোর বা প্রান্তিক বাহক ধরা পড়লেও মূল গডফাদার থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।টিটুর অপরাধের শিকড় গাঁথা তার পরিবারেই। তিনি কুখ্যাত ডাকাত মছনের জামাতা। স্থানীয়দের অভিযোগ, টিটুর স্ত্রীও একসময় শ্বশুরের অপরাধ কার্যক্রমে সক্রিয় সমর্থক ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তার চলাফেরা ও কথাবার্তায় দম্ভ স্পষ্ট—সে নিজেকে রাজা মনে করে, আর বাকিদের প্রজা। হলদিয়া এলাকার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ তার ভয়ে সর্বদা আতঙ্কে থাকে।স্থানীয়দের দাবি, দৃশ্যত কোনো বৈধ ব্যবসা না থাকলেও ডাকাতি ও ইয়াবার টাকায় টিটু গড়ে তুলেছে বিলাসবহুল জীবনযাপন—আলিশান বাড়ি, দামি গাড়ি, জমি কেনা, ব্র্যান্ডেড পোশাক, আর জমিদারী স্টাইলের চলাফেরা। এক সময় বেকার থাকা টিটু হঠাৎ দামি গাড়ি, মোটরসাইকেল, ব্র্যান্ডেড পোশাকে এলাকায় হাজির হয়। বৈধ আয়ের উৎস না থাকলেও তার জীবনযাপন ধনকুবেরদের মতো।স্থানীয়দের ভাষ্যে, টিটুর আচরণ দেশের কুখ্যাত সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম বা সুব্রত বাইনকেও হার মানায়। কারও প্রতিই তার ভয় বা শ্রদ্ধা নেই। তার সামনে সহজে কেউ মুখ খোলে না। এই প্রতিবেদকের সঙ্গেও টিটু দুর্ব্যবহার করেছে। অভিযোগ জানতে ফোন করা হলে, সে রুক্ষ ও হুমকিমূলক ভাষায় কথা বলে—যেন সাংবাদিক নয়, প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলছে।উঠতি বয়সেই টিটু জড়িয়ে পড়ে অপরাধে। প্রথমে চুরি, পরে ভয়ংকর ডাকাত হিসেবে পরিচিতি পায়। মরিচ্যা বাজারে ডাকাতির সময় একাধিকবার হাতেনাতে ধরা পড়লেও প্রতিবারই ছাড়া পেয়ে যায়। তার বাবা সৈয়দ আহমদ ছিলেন কুখ্যাত ডাকাত, যিনি অন্তত ডজনখানেক মামলা নিয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জেল থেকে ফিরে অপরাধী হিসেবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। বাবার পথ ধরে তিন ভাই—কামাল, টিটু ও আনোয়ার—দুধর্ষ ডাকাত হিসেবে এলাকায় নাম কামায়।স্থানীয়দের অভিযোগ, ডাকাত পরিচয় গোপন করে টিটু যুক্ত হয় রোহিঙ্গা ক্যাম্পঘেঁষা ইয়াবা সিন্ডিকেটে। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে নাইক্ষ্যংছড়ির সোনাইছড়ি সীমান্তসহ একাধিক রুট, যেখান দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইয়াবা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসে।স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিম বলেন, “আমরা মুখ খুলতে পারি না। টিটুর আছে গায়ের জোর, টাকার জোর আর রাজনৈতিক ছায়া। গ্রামে অপরাধ ঘটলে সবাই জানে কে করল, কিন্তু কিছু হয় না।”অনুসন্ধানে জানা গেছে, টিটু ও তার ভাই আনোয়ারের নেতৃত্বে এখনো পাহাড়ি এলাকায় রাতে নিয়মিত ডাকাতি হয়। পথচারী, কৃষক, ব্যবসায়ী—কেউই রেহাই পায় না। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নেওয়া, মারধর—সবই তাদের দৈনন্দিন কাজের অংশ। এতসব অপরাধ প্রশাসনের চোখের সামনেই ঘটলেও রহস্যজনক কারণে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, টিটুর মতো গডফাদাররা একেকটা ‘ক্রাইম হাব’। এদের গ্রেপ্তার করা গেলে পুরো অপরাধ নেটওয়ার্ক ধসে পড়বে। উখিয়ার মানুষও বিশ্বাস করে, টিটু ও আনোয়ারকে গ্রেপ্তার করা গেলে মাদক, অস্ত্র, অপহরণ ও সন্ত্রাস অনেকটাই কমে যাবে।কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র জসিম উদ্দিন জানান, তার বিরুদ্ধে থাকা মামলা ও গ্রেফতারী পরোয়ানার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং দ্রুত তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
